ডাইভারসনাল ট্যাক্টিক্স (Diversional Tactics)

Manas Pal

 

ইংরেজিতে একটা কথা আছে , ডাইভারসনাল ট্যাক্টিক্স (Diversional Tactics)। ধরুন আপনি একটি বিষয়ে , একটু কন্ট্রোভার্সিয়াল বা সেনসিটিভ বিষয়ে কিছু বললেন। তখনি একদল লোক আছেন, যাঁদের আপনার বক্তব্যে আঁতে ঘা লেগেছে , বা যুৎসই উত্তর দিতে পারছেন না , তাঁরা এমনসব প্রশ্ন তুলবেন বা রেফারেন্স টানবেন যাতে আপনার মূল বিষয়টি থেকে দৃষ্টি ঘুরে যায়। বা আপনার বক্তব্যটি লঘু করে দেয়া যায়।

 

সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা হল , বাংলাদেশ -এর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একদল জুটে গেলেন - ''বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে নিন্দা করছেন , তা ভারতের সংখ্যা লঘুদের উপরে আক্রমণ নিয়ে বলুন''। আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধু তো আমার এক পোস্টের কমেন্টে গিয়ে আবার আমাকে উইঘুর , রোহিঙ্গ্যা দেখিয়ে এনেছে। এখন আমি তাকে বলতে পারি - শোন , উইঘুর দের চীন সরকারের স্ট্যাডি জেনোফোবিক আক্রমণ নিয়ে কথা বলতে গেলে তো হ্যান চাইনিজ মানসিকতা , মিডল কান্ট্রি সিনড্রোম , চীন সরকারের পাওয়ার ইম্পোর্ট/ সাপ্লাই পলিসি , ই টি আই এম , এসব অনেক কিছু নিয়ে কথা বলতে হবে, সঙ্গে সূত্র হিসাবে চলে আসবে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জুম্ম গোষ্ঠীর রেফারেন্স। .. এসব .., না তোর এতো সময় আছে, না আমার এতো ধৈর্য্য। বলতে পারতাম বলিনি , কারণ একটা থেকে আরেকটা --সবারই কাজকর্ম আছে ।

 

Hitlar-Stalinসে যাই হোক, ডাইভারসনাল ট্যাক্টিক্স (Diversional Tactics) --এটা ডান - বাম সবারই কমন কৌশল। কোনো বামপন্থী হয়ত হিটলার এর নিধনযজ্ঞ নিয়ে কোন কিছু লিখলেন , তো আরেকদল এসে সঙ্গে সঙ্গে দেখিয়ে দেবেন বামপন্থীদের গুরুদেব টাইপ স্ট্যালিন ঠান্ডা মাথায় হিটলার এর চেয়েও বেশি নরমেধ চালিয়েছিল, নিজের প্রতিপক্ষ নেতাদের ধরে ধরে কোতল করেছিল।

 

বা ধরুন , আরেকজন ইতিহাস ঘেঁটে এসে ''রাষ্ট্রের চাপে সাহিত্য'' এধরণের বিষয়ে কিছু লিখতে গিয়ে বললেন জার্মানির জেলে নোবেল বিজয়ীকে পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করতে হয় -কার্ল ফন ওসিয়েৎস্কি। তাঁকে নোবেল না নেবার জন্যও চাপ দেয়া হয়, অমনি আরেকজন এসে প্রশ্ন তুলবেন - কেন এই তো কিছুদিন আগেই ২০০৯ এ চীনের নোবেল বিজয়ী লিউ শিয়াওবো কে চীনের সরকার জেলে পুড়ে দেয় নি ? সেখানে লিউ কে মারা যেতে হয়েছে কিনা ? আর রাষ্ট্র কি শুধু ওসিয়েৎস্কি কে নোবেল নিতে বাধা দিয়েছিল ? রাশিয়ান সাহিত্যিক বরিস পাস্টেরনেক কে নোবেল (১৯৫৮) নিতে বাধা দিয়েছিল কে ?

 

কেউ মার্কিন প্রেসিডেন্টদের চরিত্র নিয়ে কিছু ইঙ্গিত দিলেন , তো আরেকজন মাও -এর সবকিছু ফাঁস করে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না।

 

বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে সে দেশের বুদ্ধিজীবিরা অনেকেই সোচ্চার হয়েছেন , বাংলাদেশের সরকার এবিষয়ে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছেন বলছেন। তা, সরকার বললেই বিশেষ কিছু হবে এমন ভাবা মূর্খামি। গ্রেফতার পর্যন্তই। শাস্তি কিছু হবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে ধর্মীয় কারণে আক্রমণ হলে শাস্তি কখনো হয়নি। ২০০১ সালের রিপোর্ট-এর কি হয়েছে কেউ জানে না। শেখ হাসিনা বললেও , স্থানীয় পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা , ধর্মীয় দিগগজ রা তো প্রথম থেকেই নীরব থেকে আক্রমণকে বাড়তে দিয়েছেন। গোয়েন্দাদের কথা না বলাই ভালো। পূজায় যেখানে প্রতিবছরই এধরণের ঘটনা প্রায় হয়ে থাকে , এবার তালিবানি শক্তি মহড়ায় যে এর আশংকা বেশি ছিল এটা সবাই জানতেন , তবুও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি , ফলে ঘন্টা খানেকের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে , এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তিনদিন পরও রংপুরে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।

 

শান্তির শহর কুমিল্লায় এধরণের ঘটনা ঘটবে অনেকে ভাবতেই পারেন নি বলছেন। কেন পারবেন না। বাংলাদেশের গ্রাউন্ড লেভেল অভিজ্ঞতা কার্পেটের তলায় কতদিন ঢুকিয়ে রাখা যায় ভেবেছিলেন ? .শান্তির শহরে হঠাৎ করে হাজার হাজার লোক হঠাৎ সহিংস হয়ে উঠে এভাবে ? প্রস্তুতি ছাড়াই ? কেউ জানত না ? পুলিশ , নেতা , মোল্লা মৌলিভীরা ? -চিল্লাইয়া কন, ঠিক কিনা ? হুজুরদের মেহফিল কি বলা হয় তারা শোনেন নি ? গিয়ে শুনতে হবে এমন কথা নয়, এই সব হুজুরেরা তো ইউটিউবে প্রতিদিন প্রায় কান ঝালাপালা করে দিচ্ছেন। দাঙ্গা লাগানোর , টার্গেট গ্রুপকে এলিমিনেট করার প্রক্রিয়া বুঝতে ডোনাল্ড হরউইটস পড়তে হয় নাকি ? এসব ই তো স্পষ্টতই দৃশ্যমান ছিল। উটপাখির বালিতে মাথা গোঁজা।

 

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিদের একাংশ সরাসরি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা অভিযোগ করছেন , প্রতিবাদ করছেন।

 

আবার এর মধ্যে আরেকদল বুদ্ধিজীবী, পড়ে মনে হল এদেশীয়, বেশ একটা বুদ্ধিদীপ্ত স্টেটমেন্ট রেখেছেন - যার মধ্যে চুপি চুপি ভারতের কথাও ঢুকিয়ে দিয়েছেন ধড়ি মাছ না ছুঁই পানি গোছের। তাঁরা লিখেছেন -- ""দুঃখের বিষয় সীমান্তের এই পারে ভারতেও এই দায় রক্ষার বিষয়ে নানা শৈথিল্যের ঘটনা ঘটছে, তার কারণ ভারতের রাষ্ট্রশক্তির দর্শন ও আচরণ তার প্রতিরোধে যথেষ্ট সচেষ্ট নয় বলে আমাদের ধারণা"" -- ব্যালান্স করেছেন বোঝা যাচ্ছে। ওই যে , এটি একটি ডিভারসনাল ট্যাক্টিক্স

 

কিন্তু আমি যা বুঝতে পারছিনা -ভারতের রাষ্ট্রশক্তির দর্শন ও আচরণ - টা। রাষ্ট্র 'শক্তি 'যখন বলা হয়েছে তখন ধরে নিতে পারি বিজেপি -র কথাই বলছেন। তা, বিজেপির রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন যদি বলতে হয় তাহলে আকারে ইঙ্গিতে আর এস এস কে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু সমস্যা হল , বিজেপির রাষ্ট্রীয় দর্শন পন্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায়ের ‘ইন্টিগ্রেটেড হিউমানিজম’। আর এস এস -এর সঙ্গে জড়িত কিছু লোক রাষ্ট্র চালালেই তা রাষ্ট্রীয় দর্শন হয়ে যায় না। একটা উদাহরণ দেই , ত্রিপুরায় যাঁরা সরকারে আছেন মন্ত্রী রয়েছেন বা বিধায়ক রয়েছেন তাঁরা কি সবাই আর এস এস এর স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন ? এঁদের বেশিরভাগই তো তৃণমূল কংগ্রেস , কংগ্রেস থেকে এসেছেন। আবার ধরুন , কোনো কারণে তৃণমূল কংগ্রেস ত্রিপুরায় ক্ষমতাসীন হল , এবং সুবল ভৌমিক মুখ্যমন্ত্রী হলেন -তখন ? সুবল বাবু তো আর এস এস এর স্বেচ্ছাসেবক। তিনি তো আর এস এস শাখা পর্যন্ত করে এসেছেন।

 

Diversitional-Tacticsআবার ধরুন , পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বামপন্থী তো বটেই,আবার পড়াশোনা করা পন্ডিত ব্যক্তি , মায়াকোভস্কি নিয়ে তাঁর অসাধারণ কাজ। কিন্তু তাঁর বামফ্রন্ট সরকারই তসলিমা নাসরিন কে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দিয়েছিল - শৈথিল্য ? আজ্ঞে , তাই তো মনে হয়। এর মধ্যে এখন আবার তাঁদের বিশেষ বন্ধু, ফুরফুরা শরীফ। বামপন্থী বলে বেশ একটা নাক উঁচু করার জায়গা টি বিশেষ নেই।

 

তা বলে কি ভারতে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ হয় নি ? দাঙ্গা হয় নি ? বহু, বহু হয়েছে , বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে। কিন্তু হয়েছে কোন সময় বেশি ? কোন রাজত্বে ? কার রাজত্বে ? নেলী ম্যাসাকার মনে আছে ? কত লোক মারা গিয়েছিল -- সবাই মুসলিম -- ৩০০০ +- ( বেসরকারি মতে ১০,০০০) ….শুধু গুজরাট, গুজরাট বলে হল্লা করে কাজের কাজ যা হয়েছে তাহলে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন , আর যা হয় নি তাহলে ভারতে আর এখন পর্যন্ত আর ভাতৃঘাতী দাঙ্গা হয়নি। হ্যা , আখলাক ঘটনা ঘটেছে , কি নিয়ে ঘটেছে এটা এখনো স্পষ্ট নয় , তবে ঘটেছে তো বটেই আর এনিয়ে সবাই সরব হয়েছেন , নিন্দা করেছেন। কিন্তু কথা হল যদি গুজরাট ঘটনার জন্য মোদী দায়ী হন, তাহলে আখলাকের জন্য তো উত্তর প্রদেশ সরকার দায়ী হবার কথা ছিল - না এখানেও সুযোগ পেয়েছো শুরু করে দাও.

 

প্রায় ওই সময়ই ডিমাপুরে ফরিদ মিয়া বলে একটি রেপ এর আসামিকে জেল ভেঙে টেনে বের করে প্রায় ৮০০০, হ্যা ৮০০০ , নাগা রাস্তা দিয়ে প্যারেড করিয়ে দিন দুপুরে হাজার হাজার লোকের সামনে মেরে ফেললো - তখন তো এতো হাল্লা হয় নি , কেন হয় নি ? যারা মেরেছে তাঁরা ক্রিস্টান বলে ? । বা এমনও হতে পারে ডিমাপুর অঞ্চলে সেমা নাগা আর বাংলাদেশী মুসলিমদের মধ্যে যে ভেতর ভেতর টানাপোড়েন চলছে ( সেমিয়া ইস্যু ) তা নিয়ে উচ্যাবাচ্য না করে শ্রেয় মনে করছেন। কে জানে ‘নেলী’ না আবার সামনে আসে… এখনতো আসলে অনেকে ফরিদ মিয়ার কথা ভুলেই গেছেন

 

আরেকটা উদাহরণ দেই , পশ্চিমবঙ্গে খ্রিষ্টান নান রেপ এর ঘটনা মনে আছে ? এধরণের বীভৎস ঘটনা নিশ্চই মনে থাকার কথা। ঘটনার পর পত্র পত্রিকা টিভি তে তথাকথিত লেফট লিবারেল দের দিনের পর দিন অভিযোগ - এই ঘটনা হিন্দুত্ববাদী সংঘটনের কাজ। এই ঘটনা হিন্দুরাই করেছে। মাস খানেক এই চিৎকার চেঁচামেচির পর যা বের হয়ে এলো ,পুলিশে পাকড়াও করলো অপরাধীদের দেখা গেলো তারা বাংলাদেশী ক্রিমিনালস, কিছু স্থানীয় ক্রিমিনালদের সঙ্গে মিলে এই জঘন্য কাজ করেছে। কিন্তু মিথ্যা প্রচারের জন্য ওই সব লেফট লিবেরালস আর আরবান নকশালদের' ভুল স্বীকার করতে শুনেছেন ? না। .. দিল্লিতে চার্চ চুরি মনে আছে ?, লেফট লিবেরালস , নকশাল রা এমন চিৎকার শুরুকরলেন হিন্দুত্ববাদীদের কাজ , হিঁদুত্ব বাদীদের কাজ যে আমেরিকা পর্যন্ত গিয়ে আওয়াজ পৌছুলো -- বারাক ওবামা পর্যন্ত বক্তব্য রেখে দিলেন। পরে দেখা গেলো কিছু স্থানীয় দাগী আসামিদের কাজ , ধরা পড়ল , আর নান রেপের ঘটনার মত স্বীকার ও করলো ..কিন্তু ততদিনে যা ডাইভারশন দরকার ছিল তা হয়ে গেলো , বিশ্ব জুড়ে ...

 

আরো বলি , অরুন্ধুতি রায় বলে এক লেখিকা আছেন না ? লেফট লিবারেল আর ডাইভার্শনিস্টেস্ট দের মাতামহী তিনি। কানাডা গিয়ে ভাষণ দিচ্ছেন -- গোধরা ইনসিডেন্ট এ যে করসেবক ও হিন্দুরা পুড়ে মারা গেছে ট্রেনের কামরায় তারা সবাই বাবরি মসজিদ ভেঙে আসছিল , তাই এরকম হয়েছে। https://www.youtube.com/watch?v=TCb15I5-ujs ...তা, বিদেশের মাটিতে , কানাডায় তো আর প্রশ্ন করার কেউ ছিল না যে প্রশ্ন করবে অযোধ্যা থেকে গুজরাট ট্রেনে আসতে ১০ বছর কি করে লাগলো --বাবরি ডেমোলিশন ১৯৯২ ৬ ডিসেম্বর আর গোধরার ঘটনা ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০০২। মিথ্যা , সত্য প্রশ্ন নয় , ঘটনা যা তাহল - এভাবেই ন্যারাটিভ তৈরী করা হয়। ডাইভারসনাল ট্যাক্টিক্স (Diversional Tactics)।

Facebook
linkedin
twitter
printerst
whatsapp