Recalling childhood memories of Durga Puja
Changing shades of durga puja (AI generated representative pic)

Summary

  • In the corridors of memory, childhood Durga Puja, the warmth of a joint family, and the gentle touch of Vijaya remain timelessly alive. Over time, amidst theme pujas and modern artificiality, those cherished old days have faded away. Rising above grand pomp, the author now finds the true essence of Puja—a serene melody of peace—in bringing smiles to the underprivileged and the elders of old age homes.

 

স্মৃতির অলিন্দে আজও অমলিন শৈশবের দুর্গাপুজো, যৌথ পরিবারের কোলাহল ও বিজয়ার স্নিগ্ধ পরশ। সময়ের স্রোতে থিম পুজো আর কৃত্রিমতার ভিড়ে হারিয়েছে পুরোনো সেই দিনগুলো। আড়ম্বরের ছাঁচ পেরিয়ে আজ দুস্থ ও বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণদের মুখে হাসি ফোটানোর মাঝেই লেখিকা খুঁজে পেয়েছেন পূজার প্রকৃত সার্থকতা—এক পরম শান্তির আগমনী সুর।

পেছন ফিরে যতদূর দেখতে পাই, ভেসে আসে একটি ছবি। তখন আমি ফ্রক পরা ছোট মেয়ে, বাবার হাত ধরে য়েতাম ঠাকুর গড়া দেখতে……কুমোরটুলিতে নয়, আমাদের বাড়ির পেছনে, ঝামাপুকুর লেনে। খড়ের কাঠামো থেকে মাটির প্রতিমা হয়ে ওঠা, সে য়েন মনে হতো এক বিস্ময়কর ঘটনা! বাবা ভিড়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা, ফুচকা, আলুকাবলি, রোল খাওয়া পছন্দ করতেন না। তাই নিয়ে আমাদের ভাই, বোনের খুব দুঃখ ছিল ছোটবেলায়। কিন্তু ঠাকুর গড়ার প্রতিটি স্তর সেদিন বাবাই বুঝিয়েছিলেন। কী অপূর্ব শিল্পকর্ম!

বনেদি পরিবারের মেয়ে হয়ে জন্মানোর সুবিধা ছিল অনেক। বাবা ঠাকুর দেখাতে নিয়ে না গেলেও সে বাসনা অপূর্ণ থাকতো না। ষষ্ঠীর দিন বেরোতাম মেজো জ্যেঠু, জ্যেঠিমার সাথে। সপ্তমী তো সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন— কাকা, কাকিমা ও দুই বোন আসত রাউরকেল্লা থেকে। সে এক প্রাণখোলা আনন্দের দিন। সেদিন থাকতো — এখনকার ভাষায় Family get together…..মায়েরা ছয় জা মিলে সব রান্না করতো—ঘরোয়া বাঙালি খাবার সব,অতি সুস্বাদু।

বিকেল হলেই সাজো সাজো রব পড়ে যেত ভাইবোনেদের মধ্যে। সবাই মিলে ঠাকুর দেখতে বেরনো হতো। দুটো ঠাকুর দেখেই কাকার খিদে পেয়ে যেত, চলো ফুচকা খাই, আবার দুটো ঠাকুর দেখেই আইসক্রিম—-চলতেই থাকত। সব বাধা নিষেধের বাধন কেটে কী য়ে আনন্দ!! আমরা কলেজ স্কোয়ার, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার, মহম্মদ আলি পার্ক এসব ঠাকুর দেখতাম। তখন তো এখনকার মতো থীমের পুজো ছিল না, এত ভিড়ও হতো না—তবু লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা তো ছিলই।

সময় তো থেমে থাকে না— আমরা তখন বড়ো হচ্ছি, দিদিদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে—-সপ্তমীতে পরিবারের মিলনমেলা চলতেই থাকে। সদস্য বেড়েছে—জামাইবাবুরা আসেন তখন। স্বাভাবিকভাবেই শালা শালীদের আবদার না রেখে উপায় নেই—-সন্ধ্যা হলেই সদলবলে ঠাকুর দেখার হৈ চৈ। এরপর মামা চলে এল দিল্লি থেকে কলকাতায়।

সপ্তমীর পর্ব মিটিয়ে সেদিন রাতেই মামার সাথে চলে যেতাম মামারবাড়ি। শুরু হতো সারারাত ঠাকুর দেখা, হোটেলে খাওয়া, দশমীর সকালে বাড়ি ফিরতাম। পুজোর সাথে বিজয়ার পর্ব বাঙালিদের আরেক উৎসব। একাদশীর দিন আবার সপরিবারে মিলিত হতাম আমরা —মেতে উঠতাম কোলাকুলি,প্রণাম, মিষ্টিমুখ—সর্বোপরি নৈশভোজের সম্ভারে। এখন তো ঘরে মায়ের হাতের খাবার ক্রমশ দুর্লভ হয়ে পড়ছে। পুজোয় তো মুষ্টিমেয় ঘরে রান্না হয়। হোটেল, রেস্তোরার ব্যবসাকে মহিমান্বিত করতে সকলের বড় দরদ যেন!! সবাই একত্রিত হয়ে বিজয়া সম্মিলনী পালন আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। এখনকার প্রজন্মের কাছে হারিয়ে গেছে এসব বাঙালির সংস্কৃতি।

বিজয়া সম্মেলনের আধুনিক রূপ ‘ পার্টি’… দিন গড়িয়েছে , আমরাও বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়িতে। প্রথম প্রথম ঠাকুর দেখতে যাওয়ার পাশাপাশি ছিল ঘরে নানারকম মিষ্টি বানানো। সে এক নতুন অভিজ্ঞতা!! ছোট থেকে মাকে দেখে এসেছি বানাতে, নিজে তৈ্রি করতে গিয়ে পথের পাঁচালীর চড়ুইভাতিতে দুর্গার প্রথম বেগুনভাজা করার উত্তেজনার থেকে আমার উত্তেজনা কোনো অংশে কম ছিলনা। সবথেকে বেশি মনে পড়ে মাসিশাশুড়ির বাড়ির পুজোর কথা। লক্ষীকান্তপুরের ট্রেনে করে যেতে হত, কী ভিড় সেই ট্রেনে!! বিরাট ঠাকুর দালান জুড়ে প্রতিমা!! কী স্নিগ্ধতা মায়ের চোখে!! ভক্তি ভরে অঞ্জলি দিতাম।

Recalling childhood memories of Durga Puja
Changing shades of durga puja (AI generated representative pic)

এরপর হতো পাঁঠা বলি—কী নিদারুণ অভিজ্ঞতা!! শিশু ছাগলের সেই আর্তনাদ কী করে পুণ্যের হয়?? বলির মুহূর্তে প্রতিবার চোখ বুজে নিতাম।এই রীতি বন্ধ করার কোনো অধিকার নেই আমার, মনে হত মা কেন মেনে নেন তাঁর সন্তান নিধনের এই কদর্য প্রথা?? জোরে জোরে ঢাক, কাঁসর, ঘন্টা, শঙ্খ, উলুধ্বনির শব্দে মনে পড়ে যেত ইতিহাসের এক নির্মম প্রথার কথা। ভোজনকালে সেটা হয়ে আসতো মহাপ্রসাদ—-গলা দিয়ে নামতে চাইতো না।

মাঝে কিছুদিন সকালে বেরিয়ে বাইরে প্রাতঃরাশ সেরে ঠাকুর দেখে বিকেলের দিকে কোনো এক রেস্তোরায় দুপুরের আহার সেরে সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসতাম। এখন বাড়িতে সবাই একসাথে কাটানোই পুজোর অবসর।

সময়ের স্রোতে কতকিছু বদলে যায়। আমাদের পরিবারের সবথেকে বড় দিদির বাড়ি পুজো শুরু হলো। সেই পুজো চলছে আজ পঁচিশ বছর ধরে। অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপুজোর পদ্মফুল ফোটানো, ১০৮ টা প্রদীপ সাজানো,ঠাকুরের ভোগ সাজিয়ে দেওয়া—বাড়ির পুজোর আনন্দ। নবমীতে ঢাকের তালে তালে নাচ, গানের আসর জমে ওঠে, পরিবেশটাই বদলে যায়।

 

আবার মনে পড়ে যাচ্ছে অন্য এক অধ্যায়—পূজাবার্ষিকীর উত্তেজনা। শুকতারা, আনন্দমেলা থেকে দেশ, বর্তমান, আনন্দবাজার, এই সময় পড়ার এক অমোঘ টান অনুভব করতাম। ছোটবেলায় ভূতের গল্প পড়ে ভয় পাওয়ার একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি ছিল। খুঁজে খুঁজে আগেই সেই গল্পগুলো পড়ে নিতাম। পুজোর চারদিন কতো অবসর, সারাদিন বই পড়লেও কেউ কিছু বলবে না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে ফেলতাম একের পর এক গল্প। দুঃখ লাগে এখনকার প্রজন্মকে দেখে। নম্বর পাওয়ার ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে আর মুঠোফোনের নেশায় গল্পের বইয়ের সাথে কারুরি প্রায় সম্পর্ক নেই। কী যে হারিয়ে ফেলছে তারা জানেনা আজ, বাইরের জগৎ কতো ছোট হয়ে গেছে তাদের কাছে।

এত আড়ম্বড় বাদ দিয়ে আলাদা করে আমার এক দুর্গা পুজো আছে। প্রথমেই চোখে পড়ে সেই দরিদ্র মানুষদের যারা সারা বছর আমাদের উপকার করে যায়…..চেষ্টা করি তাদের যৎসামান্য কিছু দিতে আমার সাধ্যমত। আমাদের তো কতজন কত উপহার দেয় ওদের কজন দেয়? ওইটুকু পাওনায় ওদের চোখের উজ্জ্বলতা আমার সবচেয়ে বড় পাওনা। পাশাপাশি অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের কিছু দেওয়া, বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধাদের মন্ডপে নিয়ে যাওয়া, ভোগ খাওয়ানো—- এই আমার এখনকার পুজো। বয়সের সাথে সাথে পুজোর ভাবনা বদলে যায়।

মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘ আশ্বিনের শারদপ্রাতে….’ আগমনীর সুর বেজে উঠতো মনের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে…তার রেশ চলতো দেবীপক্ষ জুড়ে। নবমীর রাতে আমার মায়ের কন্ঠে শুনতাম ‘ নবমী নিশি গো তুমি/আর যেন পোহায়ও না….বুক ঠেলে উঠতো কান্না..তবু মনে হত মা দুর্গা যেন ‘ শান্তি দিলে ভরি….’

Raktima Chakraborty is a Kolkata-based writer and singer. Apart from writing, she is associated with different cultural activities.