পারমিতা ঘড়াই (Paramita Gharai)

February 21, 2019:

একদিন এক বাঙাল একঝুড়ি চন্দ্রবিন্দু নিয়ে যাচ্ছিল । ঝুড়িটা ছিল মাথার ওপরে। কিসে যেন হোঁচট খেয়ে সব চন্দ্রবিন্দু গুলো মাটিতে পড়ে গেল  বাঙালের পেছন পেছন আসছিল এক ঘটি। সে সব চন্দ্রবিন্দুগুলো কুড়িয়ে নিল। ব্যস!হয়ে গেল গেড়ো। ঘটিরা এত চন্দ্রবিন্দু পেলো যে তারা সবকথাতেই চন্দ্রবিন্দু লাগাতে শুরু করল। যেমন ধরুন হাঁসপাতাল, ঘুঁড়ি, নাঁক, ছাঁদ, হাঁতি এরকম আরো অনেক কিছু । ওদিকে বাঙালদের মধ্যে পড়ল চন্দ্রবিন্দুর হাহাকার। তাই চাদ, হাস, গাদাফুল, পেপে র মতো শব্দরা রইল চন্দ্রবিন্দু ছাড়া।

হাঁসছেন? নাকি হাসছেন? – সেটা আপনার ব্যাপার। তবে গল্পটা পুরোনো। কিন্তু পশ্চিমে রাঢ় বাংলা থেকে পূর্বে ত্রিপুরা অবধি অথবা উত্তরে জলপাইগুড়ি, আসামের দক্ষিণ অংশ থেকে সুন্দরবন অবধি বিস্তৃত বাংলাভাষার রকমফেরটা দেখেছেন কখনো?

-কিতা কন্ আপনি?  আমরার রাজ্যে আসেন দ্যাখবেন সিলেটি, নোয়াখালী আর চাঁটগাকে ক্যামন মিলায়ে দিইসি।

ঘুরে, দেখে আসতে পারেন ত্রিপুরা!

– ক্যানো রে বিটি? তুয়ার কি হামার জন্য টান লাই?

-আছে ,আছে। তাই তো বচ্ছর বচ্ছর ছুইটে যাই লাল মাট্টির দেইশে। তুকে ছাড়া বাংলাভাষা যে অচল।

শিয়ালদা থেকে ডাউন ট্রেনে উঠলে শোনা যায় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কথা -” হ্যা বা, আজ কাজে যাবিনি? ” আবার ভাগীরথী তীর ধরে যত উত্তরে যাওয়া যাবে ততই ‘স’ এর বাড়বাড়ন্ত।

শব্দের কথায় আসি। বর্ধমানে গাড়ি চালাতেন এক ভদ্রলোক। কাকু বলতাম। উনি এসে একদিন বাবাকে বললেন,”আজ গাড়ি বাগাচ্ছে। আসবে না।”  অনেক পরে উদ্ধার হল গাড়ি সারানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম বা নোয়াখালীর কথা ‘হুনে’  উদ্ধার করাই একটা চ্যালেঞ্জ ‘যাদু’!  যোশুরে দিদা তো প্রায়ই বলতো, ”নাতি খাতি বেলা গেল, হুতি পারলাম না।”

শুধুমাত্র কি শব্দের হেরফের?  বা উচ্চারণের?  জেলা থেকে জেলায় কথা বলার সুরও যে যায় বদলে। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এর সুর বদলে যাবে মালদা বা দিনাজপুরে।

পশ্চিমবাংলাই হোক বা পূর্ববাংলা, অঞ্চলভিত্তিক বা জেলাকেন্দ্রিক, বাংলাভাষার এত বাহার সত্যিই উপভোগ্য।

এই বাংলাভাষাই আমার মুখের ভাষা। এই বাংলাভাষার সম্মানের জন্য সেদিন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের চত্বর লালে লাল হয়েছিল। অমর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভাষাদিবসে শপথ করি,  দরকারে বা  না-‌দরকারে বাংলা ছাড়া কথা বলবো না। কাজের খাতিরে নিরুপায় হলে অন্য কথা। তাই বলে ইংরেজি বাংলা হিন্দি মিশিয়ে একটা খিচুরি ভাষায় কথা বলে আমার মায়ের ভাষাকে অসম্মান করব না।