নবমী নিশি দুর্গা পুজো
উৎসবের আলোকোজ্জ্বল আবহ সত্ত্বেও 'নবমী নিশি না হইও রে অবসান'-এর আকুলতা বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন ও অমলিন থেকে যায়।
Generating audio for this article…

সপ্তমীর আনন্দ ও কুমারী পুজোর আমেজ পেরিয়ে নবমীর রাতে দেবী উমার বাপের বাড়ি ছাড়ার বেদনায় বিষাদগ্রস্ত হয় পিকুর মন। শৈশবে বাবার হাত ধরে মণ্ডপে ঘোরার স্মৃতি থেকে শুরু করে আজকের যৌবন—উৎসবের আলোকোজ্জ্বল আবহ সত্ত্বেও ‘নবমী নিশি না হইও রে অবসান’-এর আকুলতা বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন ও অমলিন থেকে যায়।

ছোটবেলার একটা দিন এখনো পিছন ফিরে দেখলে পিকু যেন সেই দিনটিকে দেখে।
সকাল থেকেই মন খারাপ পিকুর। এবার পুজোর ছুটিতে একটা আলাদা আনন্দে গা ভাসিয়ে ছিল।

ক্লাস সেভেনের পিকু কমলাপুরে ঠাকুমার সাথে পিসির বাড়িতে এসেছে।

পিসির বাড়িতে এবছর প্রথম পুজো হচ্ছে।বাবার ছুটি নেই,তাই মাও আসতে পারেনি।আসার সময় মাকে ছাড়া আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু আসার পর মন একদম ভালো,হয়ে গেছিল।

বাঁশছন দিয়ে সুন্দর একটা ঘর,যাকে সবাই মন্ডপ বলছিল। এই শব্দটাও পিকু সেবার প্রথম শুনেছিল।

একসাথে সব ঠাকুর।।দুগ্গামা একদম মায়ের মতো লাল পাড় শাড়ি পরেছে, লক্ষ্মীর শাড়ির পাড় কমলা ছোটদিদা যেমন পরেন। আর সরস্বতীর পরেছে মিষ্টি মাসির মতো হলুদ পাড়ের শাড়ি। কার্তিক গনেশ ধুতি র সাথে ছিটের কাপড়ের ফতুয়া। সিংহকে দেখে মনে হচ্ছিল গায়ে হাত দিয়ে আদর করা যাবে। অসুর কে দেখে ভয় না পেলেও পাড়ার পরিচিত একজনকে ভেবেছে, যাকে পিকু খুব ভয় পায়।

নবমী নিশি দুর্গা পুজো
উৎসবের আলোকোজ্জ্বল আবহ সত্ত্বেও ‘নবমী নিশি না হইও রে অবসান’-এর আকুলতা বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন ও অমলিন থেকে যায়।

একচালা মূর্তির পেছনে পলাশদার আঁকা শিব ঠাকুর হাসি মুখে। পিকুর খুব ভালো লেগেছিলো সপ্তমীর সকালে পুজোর পর অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ বিতরণ করার সুযোগ পেয়ে পিকুর আনন্দ দ্বিগুণ।

অষ্টমীতে কতকি হলো। সব চেয়ে ভালো লেগেছিল ছোট একটা মেয়েকে কাঠের চেয়ারে বসিয়ে রেখে সবাই তাকে প্রণাম করছে দেখে পিকু ভেবেছিলো এই মেয়েটা কে? তারপর ঠাম্মার কাছ থেকে কুমারী পুজোর গল্প শুনেছিল।

আজ নবমী। আর একদিন ও পুরো নয়,তারপরই পুজো শেষ। তারপর বাড়ি যেতে হবে। পিকুর মন খারাপ এত তাড়াতাড়ি পুজো শেষ হয়ে যায় কেন? বড়রা বলছিল মেয়ে তিনদিন বাপের বাড়ি থেকে তার নিজের সংসারে ফিরে যায়।

ও ঠাম্মা দুগ্গা ঠাকুর কে বলো আরো কয়েকদিন থাকতে।

ধুর বোকা এটা হয়না। এই তিনদিন ই পুজো হয়। ঠাম্মা হেসে বলেছিলো।

পিকুর ছোটবেলার বায়না মনে পড়লে হাসি পায়। পিকু খুব বড় সাংবাদিক হবে ভাবে। এখন পিকু কলেজে পড়ে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় লেখা পাঠায়।

পিকু মনেমনে ঠিক করে নবমী নিয়ে একটি লেখা তৈরি করে কালকেই পাঠাবে।

সেভেনে পড়ার সময় প্রথম ভাবনায় সাথে আজকের পিকুর ভাবনায় মিল একই আকুতি তে-‘-ওরে নবমী-নিশি, না হইও রে অবসান’।

শৈশবে মনে হতো, দুর্গাপুজোর রাত বুঝি কখনও ফুরোয় না। নতুন জামার গন্ধ গায়ে মেখে, বাবার হাত শক্ত করে ধরে মণ্ডপের ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতাম।

ঢাকের শব্দ শুনলেই বুকের ভিতর কেমন একটা আনন্দ ছুটে বেড়াত। আলোর মালায় সাজানো রাস্তা, ধূপের গন্ধ, মণ্ডপের সামনে মানুষের ভিড়—সবকিছুই মনে হতো রূপকথার মতো। অথচ নবমীর রাতে বাড়ি ফেরার সময় মনটা কেমন উদাস হয়ে যেত। পরদিন যে মা চলে যাবেন!

তখন বিদায়ের অর্থ বুঝতাম না, শুধু চাইতাম রাতটা যেন আর একটু বড় হয়, বাবার হাত ধরে ঘোরার পথটা যেন আর একটু দীর্ঘ হয়।

আজ এত বছর পর বুঝি, সেই ছোট্ট মনখারাপের নামই ছিল নবমী নিশি।
আজও মহানবমীর সন্ধ্যায় মণ্ডপে দাঁড়ালে শৈশবের সেই ছবিগুলো ফিরে আসে।

ঢাকির হাতের দ্রুত ওঠানামা, ধূপের ধোঁয়ায় আবছা হয়ে আসা আলো, আরতির শিখায় উজ্জ্বল দেবীমুখ—সবকিছুর মধ্যে যেন হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর ছায়া দেখতে পাই।

ভিড়ের মধ্যে নতুন পোশাকে সেজে ওঠা শিশুরা ছুটে বেড়ায়, কেউ বাবার হাত ধরে টানে, কেউ মায়ের আঁচল আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের দেখে মনে হয়, এই তো সেই আমি—যে জানত না, উৎসবের আনন্দের মধ্যেও এত গভীর বিষাদ লুকিয়ে থাকতে পারে।

নবমীর রাত বাঙালির কাছে দুর্গোৎসবের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। দেবীর বিশেষ পূজা, হোম-যজ্ঞ ও মহাআরতির আয়োজনে মণ্ডপ মুখর হয়ে ওঠে। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপুজোর গাম্ভীর্য উৎসবে এনে দেয় অন্য মাত্রা।

বাইরে তখন জনসমুদ্র, রাস্তার ধারে ফুচকার দোকানে ভিড়, বন্ধুদের হাসি-আড্ডা, ক্যামেরায় বন্দি হওয়া অসংখ্য মুহূর্ত। রাত যত বাড়ে, উৎসবের উচ্ছ্বাসও তত ঘন হয়।

তবু কোথাও যেন একটা অদৃশ্য ঘড়ি টিকটিক করে মনে করিয়ে দেয়—সময় ফুরিয়ে আসছে।

ছোটবেলায় নবমীর রাতে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, মা কি সত্যিই আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন? দশমীর বিসর্জন সম্পর্কে কিছুটা জানতাম, কিন্তু তার ভিতরের আবেগ বুঝতাম না। শুধু মনে হতো, যে মাকে ঘিরে এত আলো, এত আনন্দ, এত আয়োজন, তাঁকে আর দেখতে পাব না কেন?

আজ বুঝি, বাঙালির কাছে দেবী দুর্গা শুধু অসুরদলনী নন, তিনি ঘরের মেয়ে উমা। কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়িতে এসে আবার ফিরে যাওয়ার এই কল্পনাই বিসর্জনের মধ্যে জুড়ে দিয়েছে পারিবারিক বিচ্ছেদের কোমল বেদনা।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে পুজো দেখার চোখ। এখন আর বাবার হাত ধরে মণ্ডপে ঘুরি না, নতুন জামা পরার উত্তেজনাও আগের মতো নেই। জীবনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর সময়ের হিসাব অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।

তবু নবমীর রাতে ঢাকের শব্দ শুনলে মনে হয়, সেই ছোট্ট মেয়েটি এখনও কোথাও দাঁড়িয়ে আছে—মণ্ডপের আলোয় মুগ্ধ, বাড়ি ফিরতে অনিচ্ছুক, আর মনে মনে চাইছে, এই রাত যেন কিছুতেই শেষ না হয়।

কিছু স্মৃতি বয়সের সঙ্গে পুরনো হয় না; বরং আরও আপন হয়ে ওঠে।

‘ওরে নবমী-নিশি, না হইও রে অবসান’—এই আকুলতা তাই আমার কাছে শুধু উৎসব শেষ না হওয়ার প্রার্থনা নয়। এ যেন শৈশবের কাছে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা, বাবার হাত ধরে হাঁটা সেই পথটুকু আর একবার পাওয়ার বাসনা, হারিয়ে যাওয়া দিনগুলিকে কিছুক্ষণের জন্য ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা।

নবমীর রাত পেরিয়ে দশমী আসে। প্রতিমা বিসর্জন হয়, মণ্ডপের আলো নিভে যায়, শহর ফিরে যায় পরিচিত ব্যস্ততায়। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে একবার পিছন ফিরে তাকানোর অভ্যাসটা থেকে যায়।

শিউলির গন্ধে, ঢাকের আওয়াজে, শরতের নীল আকাশে আবার ফিরে আসে সেই পুরনো দিনগুলি।

আজও মনে মনে বলি—যাও মা, আবার এসো। আর সময়, তুমি যদি পারো, নবমীর রাতটুকু একটু ধীরে কোরো।