আজকের দুর্গাপুজোয় জাঁকজমক ও থিমের আলোর ঝলকানি বাড়লেও, ছোটবেলার সেই সহজ-সরল আনন্দ যেন অনেকটাই ফিকে। সময়ের নিয়মে উৎসবের রূপ বদলেছে, প্রিয় মানুষেরাও হারিয়েছেন; কিন্তু স্মৃতিতে অমলিন রয়ে গেছে শৈশবের সেই মধুর পুজোর দিনগুলি।
“মা এলেন ঘরে, আনন্দ সবার মনে”—কথাটা শুনলেই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে ছোটবেলার দুর্গাপুজোর ছবি। শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলি ঝরার সকাল, দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ আর পুজোর আগমনী গান।
তখন পুজো মানে শুধু চার দিনের উৎসব ছিল না, পুজো ছিল সারা বছরের অপেক্ষা, আনন্দের প্রস্তুতি আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার এক সুন্দর উপলক্ষ।
আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, পুজোর সেই আনন্দের অনেকটাই যেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে। উৎসব আছে, আলো আছে, ভিড় আছে, আয়োজনও বেড়েছে। শুধু কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছে ছেলেবেলার সেই সহজ, অকৃত্রিম আনন্দ।
ছোটবেলায় পুজো আসার খবরটা যেন প্রকৃতিই আগে জানিয়ে দিত। ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই জানলা দিয়ে দেখা যেত নরম রোদ, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর উঠোনের এক কোণে ঝরে থাকা শিউলি ফুল।
পুজোর সঙ্গে এই প্রকৃতির সম্পর্ক ছিল বড় গভীর। শিউলি কুড়িয়ে মালা গাঁথা, ফুলের গন্ধে ভরে ওঠা সকাল, পুজোর ছুটির অপেক্ষায় দিন গোনা—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি।
তখন ক্যালেন্ডারের তারিখ দেখে পুজো আসার হিসাব কষতে হতো না। বাতাসে, আকাশে, মানুষের কথাবার্তায় বুঝতে পারা যেত, মা আসছেন।
পুজোর আগে বাড়িতে শুরু হতো নানা প্রস্তুতি। কারও নতুন জামা কেনা হয়েছে, কারও এখনও বাকি। নতুন পোশাকের কথা মনে পড়লেই মনটা আনন্দে ভরে উঠত।
আজকের মতো অনলাইন কেনাকাটা কিংবা পছন্দের পোশাকের বিপুল সম্ভার তখন ছিল না। দোকানে গিয়ে জামাকাপড় পছন্দ করা, দর্জির কাছে মাপ দিয়ে আসা, নির্দিষ্ট দিনে পোশাক হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা—এসবের মধ্যেও ছিল আলাদা উত্তেজনা।
নতুন জামাটা আলমারিতে তুলে রেখে বারবার খুলে দেখা, কখন পরা হবে তা ভেবে আনন্দে আত্মহারা হওয়া—এই ছোট ছোট মুহূর্তই ছিল শৈশবের পুজোর অমূল্য সম্পদ।
পরিবারের মধ্যেও পুজোকে ঘিরে তৈরি হতো অন্যরকম ব্যস্ততা। বাড়ি পরিষ্কার করা, ঘর গোছানো, আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়া, রান্নাবান্নার প্রস্তুতি—সবকিছুর মধ্যেই থাকত উৎসবের ছোঁয়া।
সংসারে অভাব থাকলেও আনন্দের অভাব ছিল না। হয়তো সবার জন্য অনেক নতুন পোশাক কেনা সম্ভব হতো না, হয়তো পুজোর খরচ সামলাতে পরিবারের বড়দের অনেক হিসাব করতে হতো, কিন্তু সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টায় কোনও ঘাটতি থাকত না।
বাবা-মায়ের সেই নিঃশব্দ ত্যাগ তখন বোঝার বয়স হয়নি। আজ বুঝি, আমাদের ছোটবেলার আনন্দের আড়ালে কত মানুষের পরিশ্রম, চিন্তা আর ভালোবাসা জড়িয়ে ছিল।
পাড়ার পুজো ছিল আমাদের জীবনের আরেকটি বড় অংশ। প্যান্ডেল তৈরির কাজ শুরু হলেই ছোটদের কৌতূহল বেড়ে যেত। বাঁশ বাঁধা, কাপড় টাঙানো, আলো লাগানো, প্রতিমা আসার প্রস্তুতি—সবকিছু দেখতে দেখতে দিন কেটে যেত।

পাড়ার কাকু-জ্যাঠারা নিজেদের কাজের ফাঁকে পুজোর আয়োজন করতেন। কেউ চাঁদা তুলতেন, কেউ মণ্ডপ সাজানোর দায়িত্ব নিতেন, কেউ আবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া সামলাতেন।
পুজো তখন কোনও একক পরিবারের অনুষ্ঠান ছিল না; গোটা পাড়াই যেন একটি বড় পরিবার হয়ে উঠত।
সেই সময় পাড়ার মানুষের মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা ছিল চোখে পড়ার মতো। কারও বাড়িতে কোনও অসুবিধা হলে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসতেন। পুজোর সময় বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে তা অন্য বাড়িতেও পৌঁছে যেত।
পরিচিত-অপরিচিত মানুষের মধ্যে কথাবার্তা হতো, নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হতো, ছোটরা বড়দের স্নেহ পেত। আজকের ব্যস্ত জীবনে প্রতিবেশীর নাম জানারও সময় হয় না অনেকের।
একই বহুতলে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থেকেও মানুষ একে অন্যের অচেনা থেকে যান। তাই পুজোর পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে গেলে শুধু উৎসবের ছবিই নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সেই আন্তরিকতাও মনে পড়ে।
পুজোর চারটি দিনের আনন্দ ছিল আলাদা আলাদা। ষষ্ঠীর দিন প্রতিমা দর্শনের উত্তেজনা, সপ্তমীর সকাল, অষ্টমীর অঞ্জলি, নবমীর ভোগ—প্রতিটি দিনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত নিজস্ব অনুভূতি।
অষ্টমীর সকালে নতুন পোশাক পরে অঞ্জলি দিতে যাওয়ার মধ্যে ছিল এক বিশেষ আনন্দ। ফুল হাতে মন্ত্র উচ্চারণের সময় কতটা ধর্মীয় অনুভূতি ছিল, আর কতটাই বা ছিল উৎসবের আনন্দ—তা হয়তো তখন বুঝিনি।
কিন্তু সবাই মিলে মণ্ডপে দাঁড়ানো, পরিচিত মুখগুলিকে দেখা, অঞ্জলি শেষে প্রসাদ খাওয়া—এসবই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখত।
নবমীর দিনটাও ছিল আনন্দে ভরা। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পছন্দের খাবার খাওয়া কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখা—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের মুক্তির স্বাদ।
স্কুলের পড়া, বাড়ির নিয়মকানুন, দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বাধ্যবাধকতা থেকে যেন কয়েক দিনের ছুটি মিলত। রাত বাড়লেও ক্লান্তি টের পাওয়া যেত না। পুজোর আলোয় সাজানো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো, এই আনন্দ বুঝি কোনও দিন শেষ হবে না।
কিন্তু দশমী এলেই মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে উঠত। প্রতিমা বিসর্জনের সময় ঢাকের আওয়াজের মধ্যেও যেন বিদায়ের সুর শোনা যেত। সিঁদুরখেলা, বড়দের প্রণাম, কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ—সবকিছুর মধ্যেই থাকত আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকা এক অদ্ভুত মনখারাপ।
মা আবার কৈলাসে ফিরে যাবেন, আবার এক বছরের অপেক্ষা শুরু হবে। ছোটবেলায় এই বিদায়ের অর্থ পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও মন খারাপ হতো। মনে হতো, আরও কয়েকটা দিন যদি মা থাকতেন!
আজ বড় হয়ে বুঝি, বিসর্জনের সেই মনখারাপ শুধু প্রতিমা বিদায়ের জন্য ছিল না। আসলে শেষ হয়ে যেত আমাদের ছুটির দিনগুলি, বন্ধুদের সঙ্গে সারাক্ষণ থাকার সুযোগ, পরিবারের সবাইকে নিয়ে আনন্দ করার সময়।
আবার ফিরে আসত পড়াশোনা, কাজ, সংসার আর দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা। সেই জন্যই হয়তো বিসর্জনের মুহূর্তে বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরি হতো।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গিয়েছে।
পুজোর আয়োজন এখন অনেক বড়, আলোর ঝলকানি আরও বেশি, থিমের বৈচিত্র্য চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছবি ছড়িয়ে পড়ে, দূরে থাকা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও ভিডিও কলে কথা বলা যায়।
বড় বড় মণ্ডপ, নামী শিল্পীর কাজ, বাহারি সাজসজ্জা—সব মিলিয়ে পুজো এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান, অনেক বেশি প্রচারিত। এই পরিবর্তনের নিজস্ব সৌন্দর্যও আছে। নতুন প্রজন্ম নিজেদের মতো করে উৎসব উপভোগ করছে, নতুন ভাবনা নিয়ে পুজোকে সাজাচ্ছে।
তবু কখনও কখনও প্রশ্ন জাগে, এত আয়োজনের মধ্যেও কি আমরা আগের মতো করে আনন্দ করতে পারছি? প্যান্ডেলে গিয়ে প্রতিমা দেখার চেয়ে ছবি তোলা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সেই ছবি প্রকাশ করাটাই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে গল্প করার বদলে প্রত্যেকে কি নিজের মোবাইলের পর্দায় বেশি ব্যস্ত থাকছি?
অবশ্যই সব ক্ষেত্রে এমন নয়।
কিন্তু উৎসবের ভিড়ে নিজেদের জন্য, পরিবারের জন্য এবং কাছের মানুষদের জন্য সময় বের করে নেওয়ার প্রয়োজনটা যেন আরও বেশি করে অনুভব করি।
শৈশবের পুজোকে সুন্দর করে তুলেছিল শুধু তখনকার আয়োজন নয়, আমাদের দেখার চোখটাও। সামান্য পাওয়ায় আমরা খুশি হতে পারতাম। নতুন জামা ছিল আনন্দের, কিন্তু সেই জামা পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার আনন্দ ছিল আরও বেশি।
প্যান্ডেলের আলো ছিল সুন্দর, কিন্তু সেই আলোয় পরিচিত মানুষদের মুখ দেখা ছিল আরও আপন। পছন্দের খাবার খাওয়া ছিল আনন্দের, কিন্তু পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার মধ্যে ছিল অন্যরকম তৃপ্তি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে, জীবনের জটিলতাও বেড়েছে। সেই সঙ্গে আনন্দ পাওয়ার সহজ ক্ষমতাটাও যেন কিছুটা কমে গিয়েছে।
আরও একটি পরিবর্তন আমাদের অনুভব করতে হয়। ছোটবেলায় যাঁরা পুজোর আনন্দের কেন্দ্র ছিলেন—বাবা-মা, দাদু-দিদা, কাকা-পিসি, প্রতিবেশী আত্মীয়রা—তাঁদের অনেকেই আজ আর পাশে নেই।
কেউ দূরে চলে গিয়েছেন, কেউ বার্ধক্যের কারণে আগের মতো সক্রিয় নন, কেউ আবার চিরদিনের মতো হারিয়ে গিয়েছেন। পুজোর সময় তাঁদের কথা আরও বেশি মনে পড়ে।
মনে পড়ে, কে কখন নতুন জামা কিনে দিয়েছিলেন, কে প্যান্ডেলে নিয়ে গিয়েছিলেন, কে পছন্দের খাবার বানিয়ে অপেক্ষা করেছিলেন। যে মানুষগুলো একসময় আমাদের আনন্দের জগৎ তৈরি করেছিলেন, তাঁদের অনুপস্থিতিই আজ উৎসবের আনন্দের মধ্যে নীরব বিষণ্ণতা এনে দেয়।
আসলে স্মৃতি বড় অদ্ভুত। বহু বছর আগের কোনও একটি বিকেল, পুজোর মণ্ডপে শোনা কোনও গান, বিসর্জনের সময় দেখা কোনও দৃশ্য কিংবা বাড়ির উঠোনে পড়ে থাকা শিউলি ফুল—হঠাৎ কোনও এক মুহূর্তে সবকিছু যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
মনে হয়, সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দিনগুলো কোথাও হারিয়ে যায়নি। তারা রয়ে গিয়েছে মনের গভীরে, অপেক্ষা করছে সামান্য কোনও উপলক্ষের। একটি গান, একটি গন্ধ, পরিচিত কোনও মুখ কিংবা মায়ের মুখে শোনা পুরোনো কথা সেই স্মৃতির দরজা খুলে দিতে পারে।
তাই আজও দুর্গাপুজো এলে মনে হয়, মা শুধু প্রতিমার মধ্যেই আসেন না, তিনি ফিরে আসেন আমাদের স্মৃতির মধ্যেও। ফিরে আসে শৈশব, ফিরে আসে সেই পাড়ার পরিচিত মুখগুলি, নতুন জামার উত্তেজনা, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো আর বিসর্জনের বিষণ্ণ বিকেল।
বর্তমানের উৎসবের সঙ্গে অতীতের সেই দিনগুলির হয়তো কোনও তুলনা হয় না, কারণ প্রতিটি সময়ের আনন্দ আলাদা। কিন্তু ফেলে আসা দিনের প্রতি টানটাও মিথ্যে নয়।
আমরা হয়তো আর ছোটবেলায় ফিরে যেতে পারব না। সময়কে থামিয়ে রাখা যায় না, হারিয়ে যাওয়া মানুষদেরও ফিরিয়ে আনা যায় না। কিন্তু পুরোনো দিনের আনন্দের কিছুটা আজও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
পুজোর কটা দিন পরিবারের সঙ্গে স আনন্দে পাশে দাঁড়িয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে মন খুলে গল্প করে আমরা উৎসবকে আরও আপন করে তুলতে পারি। যাঁরা একা, যাঁদের পাশে আপনজন নেই, তাঁদেরও আনন্দের অংশ করে নেওয়া যায়।
কারণ পুজোর আসল অর্থ তো শুধু আলোর সাজ নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধনও।
মা আসেন প্রতি বছর। ঢাক বাজে, শিউলি ফোটে, প্যান্ডেলে আলো জ্বলে, আনন্দে মেতে ওঠে চারপাশ। তবু মনের কোনও এক কোণে জমে থাকে ছোটবেলার সেই দিনগুলির জন্য একরাশ হাহাকার।
মনে হয়, আর একবার যদি ফিরে পাওয়া যেত সেই সকাল, সেই নতুন জামা, সেই পরিচিত প্যান্ডেল, সেই মানুষগুলিকে নিয়ে একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর দিন! আর একবার যদি মায়ের হাত ধরে পুজো দেখতে যাওয়া যেত, আর একবার যদি বিসর্জনের আগে মনে হতো—এবারও মা আরও কয়েকটা দিন থেকে যান!
হয়তো সেই ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
কারণ শৈশব কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না; সে লুকিয়ে থাকে আমাদের স্মৃতিতে, অনুভবে, ভালোবাসায়। তাই মা যখন আবার ঘরে আসেন, আনন্দে ভরে ওঠে চারপাশ, তখন বর্তমানের উৎসবের সঙ্গে মিশে যায় অতীতের দিনগুলি।
চোখের সামনে আলো ঝলমল করলেও মন ফিরে যায় সেই পুরোনো উঠোনে, সেই পরিচিত পাড়ায়, সেই মানুষগুলোর কাছে।
মা এলেন ঘরে, আনন্দ সবার মনে। তবু উৎসবের ভিড়ে আজও মন বলে ওঠে—ছোটবেলার সেই দিনগুলো আজ বড্ড মিস করি।
