শ্রী বীরেন্দর সিং, গ্রামোন্নয়ন, পঞ্চায়েতি রাজ ও পানীয় জল সরবরাহ মন্ত্রী
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ, ২০১৯ সাল শেষ হওয়ার আগেই ভারতকে একটি পরিচ্ছন্ন দেশে রূপান্তরিত করার আহ্বান জানিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী এই ডাক দেওয়ার পরেই কেন্দ্রীয় পানীয় জল ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মন্ত্রক গ্রামীণ ভারতে স্বচ্ছ ভারত মিশন আরও জোরদার করে তোলার কাজে সচেষ্ট হয়েছে। যে কাজগুলিতে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগ দূর করা এবং কঠিন ও তরল বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা। খোলা জায়গায় যেখানে-সেখানে মল-মূত্র ত্যাগের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্বাস্থ্যহানির কয়েকটি বিশেষ দিক। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক দিকগুলি হল – ডায়রিয়ার কারণে মৃত্যু, আয়ু কমে যাওয়া, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য। এই কারণে স্বচ্ছ ভারত মিশন চালু হওয়ার প্রথম বছরেই খোলা জায়গায় মল-মূত্র ত্যাগের ঘটনা বন্ধ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আর এই লক্ষ্যেই স্বচ্ছ ভারত মিশনের আওতায় প্রায় ৮০ লক্ষ শৌচাগার ইতিমধ্যেই নির্মাণ করা হয়েছে। তবে, এখানে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হল, শুধুমাত্র শৌচাগার নির্মাণই এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং মানুষের আচরণগত পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যরক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাজে সমাজের সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হল এর মূল উদ্দেশ্য। আর্থ-সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও রীতিনীতি ভেদে রাজ্যগুলি এ ব্যাপারে তাদের নিজস্ব পন্থাপদ্ধতি বেছে নিতে পারে।
খোলা জায়গায় মল-মূত্র ত্যাগের ঘটনা থেকে যখন কোন গ্রাম পুরোপুরি মুক্ত হতে পারে, তখনই সেখানে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুযোগসুবিধার প্রসার ঘটা সম্ভব। কেন্দ্রীয় মন্ত্রক তাই প্রতিটি গ্রাম যাতে এই অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস থেকে মুক্ত থাকতে পারে সেই বিষয়টির ওপরই বিশেষ জোর দিচ্ছে। এব্যাপারে যে রাজ্যগুলি ভালো কাজ দেখাতে পারবে, তাদের নানা ধরণের সুযোগসুবিধা দেওয়ার কথাও চিন্তাভাবনা করা হয়েছে।
বহুকাল ধরে চলে আসা মানুষের অভ্যাস এবং মানসিক গঠনকে পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন এক ধরণের দক্ষতা যা মানুষের আচরণগত দিক ও মানসিকতার ক্ষেত্রে সামগ্রিক বিপ্লব ঘটাতে পারে। স্বচ্ছ ভারত মিশনের আওতায় এই কর্মসূচি রূপায়ণের জন্য জেলাগুলিকে মূল ইউনিট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে এবং এই কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকদের। এপর্যন্ত সারা দেশে ২০৬ জনের মতো জেলাশাসক ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যেই তাঁদের জেলাগুলিকে যত্রতত্র মল-মূত্র থেকে মুক্ত জেলা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য তাঁরা কাজে নেমে পড়েছেন। অনেক রাজ্যেই এ ব্যাপারে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন কর্মশিবিরেরও আয়োজন করা হয়েছে।
সাম্প্রতিককালে স্বচ্ছ ভারত মিশনের আওতায় গ্রামীণ ভারতে বেশ কিছু কাজকর্ম মানুষকে নানাভাবে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। যেমন ধরা যাক, ছত্তিশগড় ও পাঞ্জাব – এই দুটি রাজ্যের কথা। শুধুমাত্র শৌচাগার নির্মাণই নয়, একইসঙ্গে মল-মূত্র ত্যাগের অভ্যাস থেকে মুক্ত গ্রাম তথা জেলার সংখ্যা যাতে দ্রুত বৃদ্ধি পায় সে ব্যাপারে এই দুটি রাজ্য এখন সাফল্যের নজির স্থাপন করতে পেরেছে। খোলা জায়গায় মল-মূত্র ত্যাগের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করাই হল এই দুটি রাজ্যের এ সম্পর্কিত পরিকল্পনার বিশেষ লক্ষ্য। ছত্তিশগড় ১৮৮৯টি গ্রাম পঞ্চায়েতকে ২০১৬-র মার্চের মধ্যে যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগের অভ্যাসমুক্ত বলে ঘোষণা করার পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে, ‘মিশন ১০০০’ চালু করে দিয়েছে পাঞ্জাব। লক্ষ্য হল, এ বছর ২ অক্টোবরের মধ্যে এক হাজার গ্রাম পঞ্চায়েতকে যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগের অভ্যাস থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করা। এব্যাপারে এক অভিনব কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে মধ্যপ্রদেশ। রক্ষাবন্ধন উপলক্ষে বোনেদের শৌচাগার উপহার দেওয়ার কর্মসূচির কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এদিকে রাজস্থানে পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রার্থী পদের জন্য একটি পূর্ব শর্তই হল বাড়িতে শৌচাগার থাকা ও তা ব্যবহার করা। অসম ও ওড়িশায় যে গ্রামগুলি এ ব্যাপারে সাফল্য দেখিয়েছে সেখানে উৎসব ও আনন্দের চেহারা দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে নদীয়াই হল প্রথম জেলা যা খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কাজকর্ম থেকে মুক্ত একটি জেলা। নদীয়ার জেলাশাসক তাঁর কাজের সাফল্যের স্বীকৃতিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ফোরামে পুরস্কৃতও হয়েছেন।
স্বচ্ছ ভারত মিশনের আওতায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যপূরণ যাতে দ্রুত সম্ভব হয়ে ওঠে সেই কারণে কর্মসূচিকে যথেষ্ট নমনীয় করে তোলা হয়েছে। যেমন, কয়েকটি জেলা তথা রাজ্য এই কাজে সাফল্যের জন্য ব্যক্তিবিশেষকে পুরস্কৃত না করে সমষ্টিকে পুরস্কারদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্মসূচিকে আরো জোরদার করে তুলতে নানা ধরণের উদ্ভাবনী পন্থাপদ্ধতির আশ্রয়ও গ্রহণ করছে বিভিন্ন রাজ্য।
সরকারি তরফে স্বচ্ছতার বার্তা দেশবাসীর কাছে সঠিক উপায়ে ও দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যও গ্রহণ করছে যাতে দেশবাসীর সঙ্গে এ ব্যাপারে সরাসরি ও খোলাখুলি মতবিনিময় সম্ভব হয়ে ওঠে।
দেশের সমস্ত পল্লী অঞ্চলে নির্মল পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেও মন্ত্রক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ব্যাপারে সহস্রাব্দের লক্ষ্যপূরণ সম্ভব হলেও গ্রামাঞ্চলে জলের গুণমানের বিষয়টি এখনও বেশ উদ্বেগ ও আশঙ্কার কারণ। তাই, মন্ত্রক সমষ্টিভিত্তিক জল শোধন প্রকল্পের মাধ্যমে উপযুক্ত মানের পানীয় ও ব্যবহারযোগ্য জল প্রতিদিন মাথাপিছু ৮ থেকে ১০ লিটার যোগান দেওয়ার এক রূপরেখা তৈরি করেছে। নকশাল অধ্যুষিত এবং অন্যান্য প্রত্যন্ত এলাকায় ২০ হাজার গৃহস্থ বাড়িতে সৌরশক্তিচালিত পাম্প ব্যবস্থায় পাইপলাইনের মাধ্যমে জল পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় বিশুদ্ধ শক্তি তহবিলের সহযোগিতায় এটি রূপায়িত হচ্ছে।
অসম, বিহার, ঝাড়খন্ড এবং উত্তরপ্রদেশে বিশ্বব্যাঙ্কের সহায়তায় ৬ হাজার কোটি টাকার এক বিশেষ প্রকল্পের কাজে হাত দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে ঐ রাজ্যগুলির ৭৮ লক্ষ গ্রামীণ মানুষের কাছে পাইপলাইনের মাধ্যমে জল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জল ও স্বাস্থ্যরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি বিশেষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক দিল্লিতে ‘ইন্ডোভেশন’ নামে তিনটি প্রদর্শনী তথা কর্মশালার আয়োজন করেছে। এই প্রদর্শনীগুলিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিনিধিরা অপেক্ষাকৃত কম খরচে অভিনব প্রযুক্তির সাহায্যে জল ও স্বাস্থ্যরক্ষার বিভিন্ন উপায় হাতে-কলমে সকলের সামনে উপস্থাপনা করে।
জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটিও এ ব্যাপারে পিছিয়ে নেই। ঐ রাজ্যে সাম্প্রতিক বন্যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রক খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিমানের সাহায্যে চলমান জলশোধন প্রকল্প ও জলের বোতল বন্যাদুর্গতদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। পুরীর সাম্প্রতিক রথযাত্রা উৎসবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও জল সম্পর্কে জনসচেতনতার লক্ষ্যে বিশেষ প্রচারেরও ব্যবস্থা করা হয়। এই ধরণের প্রচারাভিযানের ব্যবস্থা করা হয়েছে নাসিকের কুম্ভ মেলাতেও।
স্বচ্ছ ভারত মিশনের পরবর্তী অধ্যায়কে নাগরিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলা হবে যাতে ২০১৯ সালে জাতির জনকের সার্ধ শত জন্মবার্ষিকীতে তা হয়ে ওঠে তাঁর প্রতি দেশের যোগ্য সম্মান।