ProMASS News Bureau: Manabendra Nag: Sep 03, 2016: রাজ্যের বিখ্যাত বাঁশ ভান্ডার হল তেলিয়ামুড়া মহকুমার চাকমাঘাট ব্যারেজ। এটাই বাঁশ শিল্পের মুখ্য কাঁচামাল বাঁশের মজুতভান্ডার। নোনাছড়া, হলুদিয়া, কালাঝারি ইত্যাদি সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ছড়া ও নদীপথে পাহাড়ের কোল ঘেঁসে বাঁশের ভেলা হয়ে নানা প্রজাতির বাঁশ এসে তেলিয়ামুড়া-খোয়াই ব্যারেজের চাকমাঘাট নদীর তীরে জড়ো হয়। এই বাঁশ ভান্ডারে প্রতি বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক হাট বসে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বাঁশ ব্যবসায়ী এই বাঁশ ভান্ডার থেকে গাড়ি বোঝাই করে বাঁশ নিয়ে যায়। এমনকী সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশেও এই বাঁশ ভান্ডার থেকেই বাঁশ পৌঁছে যায়।

এক সময় তেলিয়ামুড়া মহকুমায় বাঁশ-বেত শিল্পের রমরমা কারবার চলতো। শিল্পীরা বাঁশ-বেত দিয়ে নিপুন হাতে নানা রকমের জিনিসপত্র তৈরি করতো এবং তাদের শিল্পকর্মগুলি ঠাঁই পেতো রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি বিপনন কেন্দ্রে। বাঁশ-বেতের জিনিসপত্র বানিয়ে বহু শিল্পী স্ব-রোজগারি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল। শিল্পীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একদিকে যেমনি বাড়তি উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি হতো, তেমনি দক্ষতার বিকাশও ঘটতো প্রতিনিয়ত। কিন্তু আজকাল বাঁশবেত শিল্পের সেই রমরমা নেই।
স্থায়ী রোজগার তথা কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব, উন্নতমানের প্রশিক্ষণে ঘাটতি ইত্যাদি নানা কারণে স্থানীয় বাঁশ শিল্পীদের মধ্যে পেশাদারি আগ্রহ তেমন আর দেখা যাচ্ছে না। অন্যভাবে বলা যায়, শিল্পীদের কর্মপরিকল্পনা, শিল্পকর্ম বিপননের সুযোগ, শিল্প দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের অভাবে তেলিয়ামুড়া মহকুমায় অ-কাঠ জাতীয় বনজ পণ্য (নন টিম্বার ফরেষ্ট প্রোডিউস বা এনটিএফপি)-এর উৎপাদন মার খাচ্ছে। এই ধরণের পণ্য-পরিবহন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, শিল্পীরা ক্রমেই কর্মহীন হয়ে পড়ছে।

বাঁশ শিল্পের বিকাশ ও এই শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার রাজ্যে প্রকল্প এবং মিশন চালু করেছে। মূলত বনজ সম্পদকে সংরক্ষণ করা এবং এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করে আর্থিকভাবে দুর্বলদের স্ব-নির্ভর করতেই এই দুটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে। কিন্তু দুটি প্রকল্পই ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেনি বলে অভিযোগ তুলেছে সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা। নোনাছড়া সহ তেলিয়ামুড়া মহকুমার দুর্গম এলাকার বাঁশ ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় ও পাহাড়ি জনপদের বাঁশ-বেত শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জাইকা এবং ব্যাম্বু মিশন সম্পর্কে এদের স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী শোনা যায়। শিল্পীরা জানালেন, তেলিয়ামুড়া বন দপ্তরের উদ্যোগে জাইকা প্রকল্পে শিল্পীদের বাঁশ-বেত শিল্পকর্ম সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণগুলি সবই স্বল্প সময়ের হয় এবং প্রশিক্ষণ চলাকালে শিল্পীদের মজুরি সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার অভাবের কারণে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক সময় শিল্পীদের আগ্রহ থাকে না।
শিল্পে দক্ষতা বিকাশের জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেসব যন্ত্রপাতি প্রশিক্ষণের পর তুলে নেওয়া হয়। এইসব যন্ত্রপাতি শিল্পীদের কাছে না-থাকায়, স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণে প্রাপ্ত দক্ষতা শিল্পীরা কাজে লাগাতে পারে না। এইসব যন্ত্রপাতি কেনার জন্য আর্থিক ঋণ বা সহায়তা প্রসঙ্গে শিল্পীদের কাছে কোন তথ্য না থাকায়, প্রশিক্ষণের বাস্তব কোন মূল্য নেই – জানালেন অরিন্দম শর্মা। যন্ত্রপাতি ছাড়াও প্রশিক্ষণ চলাকালে শিল্পীদের তৈরি করা পণ্যসামগ্রীও জাইকা বা ব্যাম্বু মিশনের শো-রুমের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে শিল্পীদের কাছে পরবর্তীকালে প্রদর্শনের জন্য কোন মডেল বা স্যাম্পল থাকে না। প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, অর্জিত দক্ষতা বাণিজ্যিক লক্ষ্যে ব্যবহার করার কোন সহায়তা বা সুযোগ না থাকায়, এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ কমছে, মন্তব্য অরিন্দমের। প্রশিক্ষণ শেষে কাজের খোঁজে, বিশেষত: মাষ্টার ট্রেনার কিংবা তার সহযোগী হিসেবে কাজের আবেদন নিয়ে বন বিভাগের রেঞ্জগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোন লাভ হয় না। সব মিলিয়ে বাঁশ শিল্প ও শিল্পীদের বিকাশে সরকার পদক্ষেপ নিলেও, বাস্তবোচিত পরিকল্পনার অভাবে ঈপ্সিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে শিল্পীদের অভিযোগ।
শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা এবং সর্বোপরি শিল্পকর্ম বাজারজাত করা সহ সমগ্র বিষয়ে সুসংহত পরিকল্পনা তৈরি না করে কেবলমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে দিলে শিল্পীদের কোন লাভ হবে না এবং ফলশ্রুতিতে বাঁশ-বেত শিল্পের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নও থমকে যাবে বলে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিমত।