সুকুমার ভদ্র
গত কয়েক দশক ধরে সারা বিশ্বে এবং অবশ্যই ভারত সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এক ভয়াল ঘাতক রোগের চেহারা নিয়েছে ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ| এত বড় ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেই অত্যন্ত কার্যকরী নাকি সামান্য ছোলার ডাল আর কাবুলি ছোলা| সাম্প্রতিক এক গবেষণা লব্ধ ফল অনুসারে এই পরামর্শ দিয়েছে হায়দরাবাদের ভারতীয় বিজ্ঞান বিষয়ক কেন্দ্র ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ক্যামিকেল টেকনোলজি|
এটা অনেকেরই জানা, মানবদেহের রক্তে উচ্চমাত্রায় চিনি বা শর্করার উপস্থিতি ডায়াবেটিস রোগ ডেকে আনে| ওজন বেড়ে যাওয়া ও স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক ইতিহাস, কায়িক শ্রমের অভাব, মাতৃগর্ভে শিশুর অপুষ্টিসহ নানা কারণ ডায়াবেটিস হওয়ার জন্য দায়ী। স্পষ্ট করে বললে, মানবদেহের অগ্ন্যাশয় যদি যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করতে না পারে অথবা শরীর যদি উৎপন্ন ইনসুলিন ব্যবহারে ব্যর্থ হয়, তাহলে যে রোগ হয় তা হলো ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ। তখন রক্তে চিনি বা শর্করার উপস্থিতিজনিত অসামঞ্জস্য দেখা দেয়।
ডায়াবেটিসের বিপদ হলো, এতে আক্রান্ত হলে, অন্য অনেক রোগের আক্রমন বেড়ে যায়| একজন ডায়াবেটিক রোগীর অন্যদের চেয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ বেশি, স্ট্রোক বা পক্ষাঘাত হওয়ার ঝুঁকি ছয় গুণ, কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি পাঁচ গুণ বেশি|
২০১৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৪২ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত| ১৯৮০-তে রোগীর যে সংখ্যা ছিল ১১ কোটির মতো| অর্থাৎ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে| আশংকা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকবেন| ২০১৫ সালের হিসেবানুসারে, ভারতে প্রায় সাত কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত |
ডায়াবেটিস-জনিত জটিলতা ঠেকানোর প্রধান উপায় হলো রক্তে শর্করা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। রক্তে শর্করা অনেক-বেশি বেড়ে না গেলে, সাধারণত – বেশি পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব বা ওজন হ্রাসের মতো উপসর্গ দেখা দেয় না। তবে এর মানে এটা নয় যে, শর্করা নিয়ন্ত্রণে আছে। নিয়ন্ত্রণ মানে হলো অব্যাহতভাবে রক্তে শর্করার পরিমাণ খালি পেটে ৬ মিলি-মোল বা তার কম, খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর ৮ মিলি-মোলের কম থাকা। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রিত আছে কি না এবং কোনো রকমের সম্ভাব্য জটিলতা দেখা দিচ্ছে কি না—এ দুটি বিষয়ে নজর রাখতে হলে, বাড়িতে সপ্তাহে এক বা দুই দিন গ্লুকোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে নিজের রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা, প্রতি তিন মাসে গড় শর্করার পরিমাপ করে ডাক্তার দেখানো উচিত|
দিনের আহারের তালিকায় বেশি করে তাজা সবজি ও ফল থাকলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে। এক্ষেত্রে, সর্বোত্তম আপেল, আঙ্গুর| তবে অন্য যে কোনো সাধারণ ও সহজে পাওয়া যায় এমন ও মরশুমী ফলও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কার্যকরী| স্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ফলের রস বা জুস খেলে যথার্থ উপকার পাওয়া যায় না। তাঁদের মতে, মূলত গোটা ফল খাওয়া হলেই সর্বাধিক ভালো ফল পাওয়া যায়|
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ক্যামিকেল টেকনোলজি (আইআইসিটি)-র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, বেশ কিছু ডাল জাতীয় শস্য যেমন ছোলার ডাল, সবুজ মটর, প্রায় অনুরূপ শুঁটি চিক-পি বা কাবুলি ছোলা নিয়মিত খেলে রক্তে শর্করার পরিমান নিয়ন্ত্রণে থাকে| আইআইসিটি-র মতে, সবচেয়ে কার্যকরী অঙ্কুরিত বেঙ্গল গ্রাম বা ছোলার ডাল| আইআইসিটি-র গবেষকরা অভিমত দিয়েছেন, আহারের আগে এই ডালের ৫০ গ্রাম অঙ্কুরিত শুঁটি খাওয়ার অভ্যাস করলে রক্তে শর্করার ভাগ সবচেয়ে ভালোরকম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়| ফল-সবজি-মটর জাতীয় শুঁটি খাওয়া ও সেই সাথে শরীর চর্চা, কায়িক শ্রম করা ও তেল-মসলার খাদ্য পরিহার করা জরুরি, না হলে ডায়াবেটিসের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পাওয়া দুস্কর হবে |