“আশ্বিনে শারদপ্রাতে……” সেই কোন ছোটবেলা থেকে মনের মাঝে ঢাকে কাঠি পড়ে যেত। “দুগ্গাপুজোর” আমেজ আসতো আরও আগে থেকে। তখন এত সংখ্যায় আয়োজক ছিল না, কিন্তু ঐ যে জায়গায় জায়গায় প্যাণ্ডেলের বাঁশ পড়ে থাকতে দেখলে সে মন কোন এক অজানা আনন্দে দুলে উঠত।
একটা নতুন জামা — তাতে কোন ক্ষোভ নেই, নেই কোন অভিযোগ। ঠাকুর দেখতে যাবো, এটাই শেষ কথা। তখন এলাকায় হাতে গোনা চারটে পুজো প্যাণ্ডেলের অস্তিত্ব। এত আলোর ঝলমলানি কোথায় তখন! টিউব লাইটের আলোকসজ্জা। খুব বেশি হলে ডুমের সারি। কোথাও কোথাও ক্কচিৎ কদাচিৎ কিছু কিছু সেই টুনি বাল্বের আলোর খেলা — দারুন আলো দিয়েছে !!! দেখে এসো গিয়ে।
প্যাণ্ডেলের রকমভেদ কম ছিল। তাই দেবীমূর্তি আর তার সঙ্গীসাথীরাই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বাড়ি ফিরে তারি চুলচেরা আলোচনা। সিংহ, অসুর, মোষ থেকে গণেশের ইঁদুরও আলোচনার বিষয়বস্তু । কোন প্যাণ্ডেলের চেহারায় বিশিষ্টতা থাকলে তো সে সুপারহিট।
মনে আছে, কোন্নগরের কোন একটা প্যাণ্ডেলের পাশের একটা দোতলা বাড়ির ছাদে একবার তিন-চারজন ভূত সেজে ঘুরে বেরাচ্ছিল । সেটাতেই দর্শকমহলে কি উত্তেজনা!
বাবার হাত ধরে গেছিলাম সেখানে। বাবা বললেন, “ঐ দ্যাখ, বাড়ির ছাদে ভূত।” আমার নিষ্পাপ প্রশ্ন ছিল, “কেন? ওখানে কেন ? ওরা তো শিব ঠাকুরের সাথে এসেছে নিশ্চয়ই। তাহলে প্যাণ্ডেলের মধ্যেই নেই কেন?” বাবার উত্তরটা আজ আর মনে নেই, তবে আমি সন্তুষ্ট হয়েছিলাম অবশ্যই।
দমদম পার্কের মন্দিরের পুজো ওখানে সবচেয়ে পুরোণো বলেই জানি। তবে ওখানে আরও বড় একটা আকর্ষণ ছিল চারদিনে চারটে যাত্রাপালা এবং তার আগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-বয়স-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে মাঠের মধ্যে মাটিতে বসে(কোন চেয়ার থাকত না) একসাথে অনুষ্ঠানের আনন্দ নেওয়ার অনবদ্য অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে পেরেছিলাম বলে নিজেকে ভাগ্যবান বলে গণ্য করি।

দমদম শ্যামনগর বারোয়ারিতলার পুজো এখানকার সবচেয়ে পুরোণো। রুদ্ররূপিনী অসুরদলনীর সে রণচণ্ডী রূপ আজও তার ট্র্যাডিশন বজায় রেখে চলেছে। কিন্তু সেদিন মাতৃমূর্তির সামনে হাত জোর করে কি চাইতাম মনে নেই, তবে প্রত্যেকবার পরেরবারে দেখতে আসার আকুতি থাকত এটা মনে আছে।
তখন দমদম পার্কের চার নম্বর ট্যাঙ্কের ধারে একটা পুজো হোত। জলে পড়ত মায়ের ছায়া। সেই ছায়া দেখাতে কাকাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতাম।
কোন্নগরের সাধুর গলির মুখের মন্দিরের পুজো হোত পাকা ঘরের মধ্যে, যা ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। অপেক্ষাকৃত অনেক ছোট একচালার প্রতিমা সেখানে, কিন্তু ওখানে পুজো দেওয়ার জন্য মানুষের ঢল নামত।
প্রথমবার বাগবাজারের পুজো দেখতে গিয়ে তো অবাক। অন্য জায়গার প্রতিমা তো মানবীর মূর্তি, কিন্তু এখানে এমন অদ্ভুত রূপ কেন ? বিশেষ করে অত্ত বড় বড় চোখ ! কিন্তু কি সুন্দর! তখন প্যাণ্ডেল ছিল খোলা। তাই মেলায় ঘুরতে ঘুরতে কতবার যে ঐ মাতৃপ্রতিমা দর্শন করেছি তার কোন হিসেব নেই।
সেবার বাগবাজারেই আর একটি ঠাকুর দেখেছিলাম, কিন্তু সেটা কোন এক বনেদী বাড়ির পুজো ছিল। সেখানে চারিদিকে লোকজন এত গম্ভীরমুখে ঘোরাঘুরি করছিল যে সেটা আমার মোটেই পছন্দ হয় নি। মনে হয়েছিল যে লোকে পুজোয় কোথায় খুশিমনে ঘুরবে, তা নয়! গোমড়াথেরিয়াম (সুকুমার রায়ের “হযবরল” ততদিনে হাতে এসে গেছে বাবার হাত দিয়ে) হয়ে ঘুরছে!
একবার পুজোর সময় বিকেল থেকে প্রবল বৃষ্টি। সন্ধ্যে হয়ে এল, তবু বৃষ্টি থামে না। সে কি মন খারাপ! সেবার ঘরের মধ্যে থেকে মা দুর্গাকে ডেকেছিলাম, ” ঠাকুর বৃষ্টিটা থামিয়ে দাও তাড়াতাড়ি, তোমাকে দেখতে যাব।”
কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি সত্যিই থেমেছিল বোধহয় ঘন্টা দুয়েকের জন্য। বাড়ির সবাই মিলে দুটো ঠাকুর দেখেছিলাম। পরে আবার জোর বৃষ্টি নেমেছিল। ততক্ষণে খুশির ঘড়া সেদিনের জন্য পূর্ণ।
সময় চলল আপন পথে। জীবনটা বদলাতে থাকল। একে একে কাছের কিছু কিছু মানুষের সাথে চিরবিচ্ছেদ ঘটল। বয়সের সাথে সাথে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এল।
“পুজো”র ও পরিবর্তন আসতে থাকল সময়ের হিসেব মেনে। প্যাণ্ডেলের, প্রতিমার, আলোকসজ্জার বদল হতে থাকল। আস্তে আস্তে মা-বাবার হাত ছেড়ে বন্ধুদের সঙ্গ বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠল।
বাইরের খাবার জিভের স্বাদ বদলাতে থাকল। প্রতিমা দর্শন ছেড়ে “পুজোর আড্ডা”য় সময় দিতে আগ্রহ বাড়তে থাকল।
দুর্গাপুজোর সন্ধ্যার ভীড় ভালো লাগে না। তাই একটু ফাঁকা ফাঁকা সল্টলেকের পুজোগুলোর প্রতি একটা দুর্নিবার আকর্ষণ বারবার নিয়ে গিয়ে ফেলতো সেখানে।
স্কুল জীবনের বন্ধুদের অভাব ছিল না সেখানে। তাই, পকেট গড়ের মাঠ তো কি হয়েছে ? হেঁটেই চার’পাঁচ কিলোমিটার একদিকে যাওয়া আবার ততটাই ঐ হেঁটে ফেরায় কোনো ক্লান্তি ছিল না। হাত খরচের পয়সায় চা-সিগারেট চলত। মাঝে মাঝে অল্প কিছু খাওয়া-দাওয়া ।
এখন ভাবতে অবাক লাগে, খিদে পেলে তো চা খেয়ে খিদে মারতাম, তারপর আবার পুরোদমে ….।
“জয় জগন্মাতা” ।
