ইউনেস্কো স্বীকৃতি ও বাস্তবতার মেলবন্ধনে কলকাতা দুর্গা পুজো উপলক্ষ্যে মা দুর্গা ও তাঁর সন্তানদের সাধারণ মেহনতি ও প্রাত্যহিক মানুষের রূপে আঁকা পেন্সিল স্কেচ চিত্রশিল্প
পেন্সিল স্কেচে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কলকাতার দুর্গা পুজো ও লোকশিল্পের এক নান্দনিক মিশ্রণ। (Photo courtesy: Malay Sarkar)
Listen to this article 0:00 / 0:00

বারো ইয়ারীদের পুজো যখন শত বা হাজার বা লাখ ইয়ারীর হয়, তখন কেমন চেহারা নেয় শহর কলকাতা?

ভিড় ঠেলে কোনোক্রমে গাড়ি পার্কিং এর কাছে আসতে পারাটাই একটা বিশাল অ্যচিভম্যান্ট। উফ! এসময়ে রাস্তায় বের হওয়া মানেই ভিড় ঠেলা। সারা ফুটপাত বাঁশ বাঁধা আর লম্বা চওড়া হোর্ডিং এ ঢাকা। কবি শঙ্খ ঘোষের বইটার নাম মাথায় আসে- ” মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে”। পুলিশের অতি তৎপরতায় কারো জো নেই যেখান সেখান দিয়ে রাস্তা পার হবে।

কলকাতা শহর উৎসবে ভাসছে।

ইংরেজি ক্যালেন্ডারে সারা বছর অপেক্ষা করে শেষ পর্যায়ে আসে শরতের দুর্গাপুজো। গ্রামাঞ্চলে শিউলির গন্ধ, কাশের দোলন, ছাতিম ফুলের মাদকতা কলকাতার আকাশ বাতাসকে ছোঁয় কি? শহরের আনাচে কানাচে কোনো বিবর্ণ গলির ফাঁকে, কোনো স্কুলের সামনের ফুটপাতে, বা কলেজের মাঠে শিউলি বা ছাতিমের দেখা মিললেও, কাশফুল? নিউটাউনে যেতে হবে – ঐ ছিটেফোঁটা দেখার জন্য। শহর কলকাতায় শরৎ আসে বর্ষার জলে রাস্তাঘাট ভেসে যাওয়ার পরে। ভ্যাপসা ভাদ্র মাসের ঘামে নাজেহাল হয়ে শেষদিনে বিশ্বকর্মা পুজো। সেদিন ঘুড়িগুলো ভোকাট্টা হয়ে সাদা  মেঘের উড়ে বেড়াবার খুশি নিয়ে ল্যাম্পপোস্টে আছড়ে পড়ে। বিল হাতে বাড়িতে বাড়িতে ক্লাবের ছেলেরা ভিড় করে। বাঁশ পড়ে ক্লাব লাগোয়া একচিলতে ফাঁকা জায়গায়। বড়ো বড়ো শপিং মলে ততদিনে স্টক ক্লিয়ারেন্স সেল শেষ। জায়গা করে নিয়েছে নতুন ফ্যাশনের জামাকাপড়।  আজকাল অবশ্য নানারকম বাজারী অ্যাপের দৌলতে সারা বছরই অনলাইনে নতুন জামাকাপড় কেনাকাটা চলে। তবুও পুজোর সময় জেল্লার চমোকে চমকে দেবার একটা ব্যাপার তো থাকেই। তাই বোনাসের টাকা হাতে করে গড়িয়াহাট, হাতিবাগান, নিউ মার্কেটে ভিড় করে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের  মহিষাসুর নিধনের কাহিনী শেষ হবার পর থেকেই চেনা শহর অচেনা হয়ে ওঠে। রূপকথার যাদু কাঠির ছোঁয়ায় ঝলমলিয়ে ওঠে কল্লোলিনী কলকাতা।

ইতিহাস বলে ১৬১০ সালে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা কলকাতায় প্রথম দুর্গাপুজো করেন। এরপরে ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব। তবে বারোয়ারি দুর্গাপুজো শুরু হয় ভবানীপুরে। ১৯১০ সালে  ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার সদস্যরা এই পুজো আয়োজন করেন। এরপর বারোয়ারি পুজো ছড়িয়ে পড়ে কলকাতা শহরে। যার  রেশ একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি। পৃথিবীর বিখ্যাত উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম হল আমাদের দুর্গাপুজো। কিন্তু এ কি খালি আরতি, মন্ত্র,ফুল ধূপধুনোর পুজো? এটি শারদোৎসব যা কেবলমাত্র দুর্গাপুজোর মধ্য আটকে নেই।

সারারাত জেগে টালা থেকে টালিগঞ্জের গন্ডি পার করে ঠাকুর দেখার মজাই আলাদা। থিমের পুজোয় কোনো বারোয়ারি মন্ডপ তুলে ধরে রবি ঠাকুরের সহজপাঠ, কোনো পুজো প্যান্ডেলে দেখা মেলে সুন্দরবনের জেলেদের, কোথাও সমসাময়িক ঘটনার বর্ণনা, কোথাও বা পৌরানিক কাহিনীর ছায়া। কোথাও সাবেকীয়ানা, ডাকের সাথে জগৎজননী।

ইউনেস্কো স্বীকৃতি ও বাস্তবতার মেলবন্ধনে কলকাতা দুর্গা পুজো উপলক্ষ্যে মা দুর্গা ও তাঁর সন্তানদের সাধারণ মেহনতি ও প্রাত্যহিক মানুষের রূপে আঁকা পেন্সিল স্কেচ চিত্রশিল্প
পেন্সিল স্কেচে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কলকাতার দুর্গা পুজো ও লোকশিল্পের এক নান্দনিক মিশ্রণ। (Photo courtesy: Malay Sarkar)

রঙিন আলো ঝলমলে মন্ডপের রাস্তার ফুটপাতে দু’পয়সা রোজগারের আশায় ডালা পেতে পশরা সাজায় খুঁটে খাওয়া মানুষের দল।

তাদের না আছে নতুন জামা। না আছে পুজোর সাজ। মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমানের বা অন্য কোনো জেলার কোনো অজানা অখ্যাত গ্রাম থেকে এসে ফুটপাতে সাজিয়ে রাখে কাঠের হলুদ পেঁচা, বাহারী কাঠের টেবিল, ডোকরার গয়না, হাতে বানানো গয়না, পটচিত্র। ছোটদের বেলুন, রঙিন খেলনা, পালকের টুপি, ভেঁপু বিক্রি করার জন্যও  ভিড়ই তো দরকার। জমে ওঠে খাবারের ব্যবসাও। ফুচকা, এগরোল থেকে শুরু করে মোমো, চাওমিন, বিরিয়ানির মতো রাতের খাবার মিলে যাবে যেকোনো পুজো প্যান্ডেলের সামনে। ছেলেমেয়ে নিয়ে গোটা পরিবার একটু বাড়তি রোজগারের জন্য পুঁজি করে পুজোর কটা দিন। ঠিক যেভাবে ঢাকীরাও দিন গোনে পুজো কবে শেষ হবে! তবেই তো মিলবে নগদ টাকা, নতুন জামাকাপড়। ওদের বাড়ি ফিরে সন্তানের হাতে তুলে খুশি হবার দিন আসে পুজোর পরেই।

সারারাতের ক্লান্তি কাটিয়ে পুজোর সকালের শান্ত ফুটপাত। চায়ের স্টল এর শূন্য বেঞ্চে ঘুমন্ত বছর দশেকের বাচ্চা। ছাই এর গাদা সরিয়ে দিন শুরুর প্রস্তুতি শুরু হয় ধীর গতিতে।

শহর কলকাতায় পুজোর হাওয়ায় টাকা ওড়ে। বাঁশ বেঁধে মন্ডপের কাঠামো তৈরির সময় থেকেই ওড়ে।  তুমি আমি ব্যস্ত থাকি ব্র্যান্ডেড জামা, জুতো নিয়ে, নতুন হেয়ার আর স্কিন ট্রিটমেন্ট নিয়ে। সেখান থেকে টাকা লোটে বহুজাতিক সংস্থা। সেটা আমাদের গা সওয়া। কিন্তু দিন আনার দিন খাওয়া মানুষগুলো টাকা কুড়িয়ে নেয় পুজোর ঐ কটা দিনই।

কলকাতার পুজো। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর (UNESCO) ১৬তম অধিবেশনে কলকাতার দুর্গাপূজা ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’  হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।  ধর্মের সাথে শিল্পের মেলবন্ধন করে মৃৎশিল্প, আলোক শিল্প,  মন্ডপ নির্মাণ, শব্দ ক্ষেপণ ,  কারুশিল্প ও কুটির শিল্পের নান্দনিক মিশ্রণ এবং ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে উৎসবের আনন্দে সামিল হবার নামই কলকাতার পুজো। সকলকে আপন করে নেবার নামই দুর্গাপুজো। ধর্ম , পৌরানিক কাহিনী আর ইতিহাসকে বহমান রেখে সামাজিকভাবে সকলের সাথে একাত্ম হওয়াই হল দুর্গাপুজো।

Paramita Gharai is a prolific writer. Her interests vary from travel, art and culture, social issues and creative writing. She contributes in enewstime and other reputed media houses.