Paramita Gharai
August 15, 2019: সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে অনিমেষবাবু একধাক্কায় পিছিয়ে গেলেন বাহাত্তর বছর। পুরোনো স্মৃতি তার কিছুই নেই । যেটুকু আছে তা বাবা,দিদি আর দাদার কথা শুনে ।
ছেচল্লিশের দাঙ্গার ঢেউ সেদিন আছড়ে পড়েছিল বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে থাকা একটুকরো সবুজ ভূখন্ড সন্দ্বীপেও। ব্যবসায়ী শ্রীদাম কানুনগো আজিমপুর গ্রামের ধনী মহাজন। ঘরবাড়ি জমিজমা আর তেজাগরী কারবার ছাড়াও সন্দীপ টাউনে তাঁর সোনার দোকান। লেঠেল আমজাদ সর্বক্ষণ তাঁর ছায়সঙ্গী। এলাকায় ছিদাম মহাজনের ভীষন দাপট। তবুও দাঙ্গার আঁচ এসে লাগলো তার পরিবারে। ধানের গোলা লুঠ করে গোয়ালের চালে একরাতে আগুন দিল গুন্ডারা। ছিদাম মহাজন বুঝলেন সন্দীপ আর নিরাপদ নয়। পরদিনই রাতের অন্ধকারে আমজাদকে সঙ্গে নিয়ে নৌকো করে দ্যাশ ছাড়লেন। সঙ্গে কিশোরী মেয়ে, দুই ছেলে আর ভরা মাসের পোয়াতি বৌ। রাতের অন্ধকারে ডিঙি নৌকো নিয়ে এসে পৌঁছলেন সন্দ্বীপ শহরে। মাঝরাতে উঠলেন বন্ধু বাদাম সদাগরের বাড়ি। বাদাম সদাগর শহরের ধনী ব্যবসায়ী, সাগরে তার টাকা খাটে ব্যবসার কাজে। সন্দ্বীপ জুড়ে তার নামডাক। শ্রীদাম মহাজনের সঙ্গে তাদের পারিবারিক বন্ধুত্ব। ভোররাতের মধ্যে আমজাদকে ফিরতে হবে আজিমপুর। আর দেরী করলে না সে। চোখের জলে কর্তা আর গিন্নি মার পায়ে প্রণাম করে বিদায় নিল সে। শ্রীদাম বললেন,”ভিডামাডি রইল তোর জিম্মাত। দাঙ্গা থাইমলে আবার চলি আসমু। তুই ভালা থাইস।”
মাত্র দুদিনের মধ্যেই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বাদাম সদাগর। তাঁর নৌকোতেই বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে শ্রীদাম এসে পৌঁছেছিল কুমীরাহাট ।
আসার সময়ে সদাগরের বিবি বারবার বলেছিলেন,” দিদিরে রেখি যান। হেতের শরীর কিন্তু ভালা নাই ।” মহাজন সবই বুঝেছিলেন। কিন্তু মুসলমানের ঘরে গিন্নিকে রাখতে মন চাইছিল না তাঁর। অথচ শরীরের যা অবস্থা , এতটা ধকল গিন্নি সইতে পারবে না । সদাগরের বিবির কথায় নিমরাজি হয়েছিলেন তিনি । ভেবেছিলেন, চেনা বন্ধুই তো। থেকেই যাক। দাঙ্গা থামলে তো ফিরেই আসবেন।
বাধ সাধলেন গিন্নি । কর্তা ছেলেমেয়েদের ছেড়ে তিনি কিছুতেই একা থাকতে রাজি হলেন না। তাছাড়া যতই বন্ধু হন, যতই ভালো হন ওরা তো মুসলমান!
কুমীরাঘাট থেকে নৌকো করে যখন শ্রীদাম যখন নোয়াখালীর গোয়ালন্দঘাটে এলেন তখন সন্ধ্যে । ঘাটে হোগলার ছাউনি দিয়ে বেশ কতগুলো খাবারের দোকান। এখন আপাতত এখানেই রাতের খাবার খেয়ে নিতে হবে। নৌকোতেই দুজন কলকাতামুখী বেশ কিছু লোকজনের সাথে আলাপ হলো শ্রীদামের। সবাই পরিবার নিয়ে চলেছে কলকাতায়। ইচ্ছে, সেখানে কোনো আত্মীয়পরিজনের বাড়িতে কয়েকদিন কাটিয়ে আবার দেশে ফিরে আসবে। শ্রীদামের তো আত্মীয়স্বজন ও সেখানে নেই। এখন আর ওসব ভেবে কাজ নেই। এখন এই রাতে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে হবে। ঐ দুজনেই হদিশ দিল ধর্মশালার। একটু হেঁটেই ধর্মশালা। একটা বড় ঘরে সবার ঠাঁই হল।
সেখানে অনেক লোকের সবার একসাথে শোবার ব্যবস্থা। নানা জেলা থেকে লোকে এখানে এসে ভিড় জমিয়েছে কলকাতা যাবে বলে। তাদের নানারকমের কথা। কোথায় কতজন খুন হয়েছে, কাদের ধান লুট হয়েছে, বাড়ি পুড়েছে… একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবার মুখে। ব্রিটিশ বলেছে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানে যাবে। হবে মুসলমানদের দেশ।ওরা নাকি কখনো দেশে ফিরতে পারবে না।
ভাবতেই চিকচিক করে ওঠে শ্রীদামের চোখের কোন। তা আবার হয় নাকি! আজ কত পুরুষ ধরে আজিমপুর বাস ওদের। বললেই হল! বিদেশী রানীর কথাত ভিটেমাটি ছাড়মু নাকি! ”বেশ তো আছিলাম হিন্দু মুসলমানে। ইংরেজরা যে নেতাগোরে কি বুঝাইলো ! ‘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রীদাম।
শ্রীদাম কখনো এত লোকজনের সাথে ঢালাও বিছানায় একসাথে ঘুমোননি। গিন্নি তো আড়ষ্ট। নিজেকে বড়ো অসহায় মনে হচ্ছিল তাঁর। এই ভরা মাসে গিন্নির কষ্টটা অনুভব করে নিজেকে অপরাধী ভাবছিলেন তিনি। পথশ্রমে ক্লান্ত ছেলেমেয়েরা, শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়ল। তিনি দুচোখের পাতা এক করতে পারলেন না। চোর-ছ্যাঁচড়ের অভাব নেই এখানে। তাছাড়া কিশোরী মেয়ের দিকে কারোর নজর পড়াটাও অস্বাভাবিক নয়। অন্ধকার থাকতে থাকতে বের হতে হবে। পৌঁছতে হবে কুষ্টিয়া। চোখ লেগে এসেছিল কখন কে জানে । হঠাৎই একটা গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দেখেন গিন্নি ব্যাথায় ছটপট করছে ।
-কি হইছে? শ্রীদাম জিজ্ঞেস করল ।
-প্রচন্ড ব্যথা হইতেছে গো। ব্যাথা উঠছে।
– তাইলে …
আশপাশের কয়েজনও জেগে উঠেছে । তারাই পরামর্শ দিল ।
– একটা কাজ করেন দেখি। বৌটারে হাসপাতালে দিয়া দ্যান।
হাসপাতালে! আঁতকে ওঠে শ্রীদাম। সদ্যপরিচিত একজন বললেন ,”আরে হাসপাতালে ডাইকতার আছে। ওখানেই বাচ্চা হবে।”
গিন্নির যা অবস্থা আর ফেলে রাখা যায় না। তাছাড়া এখানে দাই পাবেন কোথা থেকে? কোনোরকমে একটা ভ্যানের জোগার করে গিন্নি কে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন শ্রীদাম। মেয়েটার জিম্মায় দুটো ছেলে ধর্মশালাতেই রইল। অনেক দৌড়াদৌড়ি করে গিন্নিকে হাসপাতালে ভর্তি করে যখন ফিরলেন তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। আগেই আসতেন। পথের মধ্যে দু’দলের দাঙ্গা । তরবারি দা লাঠি সড়কি কিছুই বাদ নেই। চোখের সামনে পিঠের ওপর ছোরা বসিয়ে দিল পেছন থেকে। আড়াল থেকে সব দেখলেন শ্রীদাম । না , এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়।
”কিন্তু বৌটারে ছাইড়া যামু ক্যামনে?” মনে মনে ভাবেন শ্রীদাম, ”দুইটা দিন দ্যাখি, এর মইধ্যে বাইচ্চাটা হয়ে গ্যালে এক্কেবারে সবসুদ্ধ ট্রেনে উঠমু।”
আগের রাতের মতো ঢালাও বিছানায় দুই ছেলে আর মেয়েটাকে নিয়ে শুতে হল। সারাদিনের ঘোরাঘুরির ধকলে শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল ছেলের চিৎকারে। বড়ছেলে অবিনাশ বাবাকে ধাক্কা দিয়ে কেঁদে চিৎকার করে উঠল, ” বাবা,দিদি রে নিয়া যায়। ”
শ্রীদাম ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন । আরো কয়েকজনের ও ঘুম ভেঙে গেছে। খোলা দরজা । জনা পাঁচেক লোক দৌড়ে পালিয়ে গেল। খুকির মুখ-হাত-পা গামছা দিয়ে বাঁধা ।
আর অপেক্ষা করেনি শ্রীদাম। সেদিন ভোররাতে দুইছেলে আর মেয়ের হাত ধরে ট্রেনে চেপে বসেছিল। নদীয়া জেলার রানাঘাটে জায়গা হয়েছিল তাদের ক’দিনের চেষ্টায়। তারপর কুষ্টিয়ায় ফিরে গেছিল সে। গোয়ালন্দঘাটে গিয়ে খোঁজ করলো বৌয়ের। হাসপাতাল , ধর্মশালা, স্টেশন , বাজার …. না কোথাও বাদ দেয় নি শ্রীদাম । কিন্তু কারোর কাছে কোনো হদিশ পেল না বৌটার। ওদিকে তিন ছেলেমেয়েকে একা রেখে এসেছে অজানা জায়গায়, অচেনা লোকের কাছে । দিন পনেরো পরে ফিরে এল শ্রীদাম । খুকি জিজ্ঞেস করল, ” মা কই?” শ্রীদাম দুহাতে মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।
অনিমেষবাবুর এই কথাগুলোই মনে পড়ল । রানাঘাটে গিয়ে কপর্দকহীন বাবার লড়াই। উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা নিয়ে একা একা তিন ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন শ্রীদাম। কলেজের গন্ডি পার করে দিদির ভালো বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে অবিনাশ কলেজের প্রফেসর আর ছোট অনিমেষ ইঞ্জিনিয়ার।
শ্রীদাম আর কখনো দেশে ফিরতে চায়নি। দেখতেও চায়নি ফেলে আসা ভিটে। অনিমেষের আর মায়ের মুখ মনে পড়ে না। তিন বছরের শিশুর কাছে মায়ের থেকে দিদিই আপন । সমুদ্রের ধারে ভেঙে পড়া বাড়ির পাঁচিলের একটা অংশ এখনো আছে । আমজাদের নাতিকে খুঁজে বের করেছে অনিমেষ। সেই নিয়ে এসেছে তাকে এই সাতপুরুষের ভিটে দেখাতে । নীচু হয়ে এক মুঠো মাটি তুলে কপালে ঠেকালো অবিনাশ।